২০১১ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন তার মুখে সারাক্ষণ একটিই বুলি শোনা যেত— “বামেরা লক্ষাধিক কোটি টাকার ঋণ চাপিয়ে গিয়েছে।” কিন্তু আজ সময় বদলেছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলার মানুষ এক নতুন ভোরের সাক্ষী হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথমবার বঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু বিদায়বেলায় মমতা সরকার বাংলার জন্য আসলে কী রেখে গেল? উন্নয়নের জোয়ার নাকি ঋণের অন্ধকার?
অভিযোগ ছিল বাম আমলের ঋণের বোঝা নিয়ে। কিন্তু তৃণমূল সরকার সেই বোঝাকে পাহাড়ের আকার দিয়েছে। সূত্রের খবর বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বিদায়বেলায় বাংলার মাথায় চাপিয়ে দিয়ে গেছে ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকার পর্বতপ্রমাণ ঋণ! বাংলার প্রতিটি নাগরিকের কাঁধে আজ বিপুল ধারের বোঝা। যে উন্নয়নকে সামনে রেখে ভোট চাওয়া হয়েছিল, তার আড়ালে কি তবে শুধুই ধার করা টাকার খেলা চলছিল? এই বিপুল ঋণের সুদ মেটানোই এখন শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের সামনে সবথেকে বড় অগ্নিপরীক্ষা। ঘটা করে ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’ হতো প্রতি বছর। বড় বড় ব্যবসায়ীদের পাশে বসে ছবি তোলা হতো। কিন্তু বাস্তবটা কী? সারা দেশের মোট বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে বাংলার ভাগ দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৬ শতাংশে! পরিসংখ্যান বলছে, বিনিয়োগ আসা তো দূরের কথা, বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে গিয়েছে প্রায় সাত হাজার ছোট-বড় শিল্প সংস্থা। সিন্ডিকেট রাজ আর তোলাবাজির সংস্কৃতি কি তবে বাংলার শিল্প স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করল?
যে বাংলাকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সেই বাংলার মানুষ আজ পেটের টানে কেরালা, তামিলনাড়ু কিংবা গুজরাটে ছুটছে। সরকারি হিসাবে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষ হলেও, বেসরকারি মতে তা ৫০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। নিজের রাজ্যে কাজ নেই, শিল্প নেই— তাই শিক্ষিত বেকার যুবকরা আজ ভিন রাজ্যে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। মমতা সরকারের ব্যর্থতা আজ বাংলাকে ‘শ্রমিক সরবরাহকারী’ রাজ্যে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বারবার অভিযোগ করেছেন, কিন্তু জমি দেয়নি তৎকালীন মমতা সরকার। রেলের জন্য প্রয়োজনীয় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টরের মধ্যে রাজ্য দিয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ জমি! শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় পরিকাঠামো প্রকল্পের ২৯০০ কোটি টাকা কোনো কাজেই লাগানো হয়নি। ১৫০০ কোটির প্রকল্প চলছে কচ্ছপ গতিতে। সংকীর্ণ রাজনীতির জন্য বাংলার উন্নয়নকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে।
এছাড়া দারিদ্র্য নিয়ে রঙ্গরাজন কমিটির পুরনো হিসেব যাই বলুক, গ্রামীণ অর্থনীতির কঙ্কালসার দশা আজ আর কারও অজানা নয়। কিন্তু অন্ধকার যত ঘনই হোক, সূর্যোদয় নিশ্চিত। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার এখন বাংলার এই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে ব্রতী। দুর্নীতি, ঋণের বোঝা এবং শিল্পের আকাল কাটিয়ে কি ফিরবে বাংলার হারানো গৌরব? বাংলার মানুষ আজ এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে। পনেরো বছরের জরাজীর্ণ ব্যবস্থা পাল্টে ফেলা সহজ নয়, কিন্তু সঙ্কল্প থাকলে অসম্ভবও নয়। এখন শুধু দেখার, এই ধ্বংসাবশেষ থেকে বাংলাকে পুনর্গঠন করার পথে কতটা দ্রুত এগোতে পারে ডাবল ইঞ্জিন সরকার।