রাজনীতিতে কথার খেলাপ হওয়া যেখানে রোজকার দস্তুর, সেখানে পাঁচ বছর আগে এক সাধারণ চায়ের দোকানদারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছেও যে মাটির মানুষের সাথে নাড়ির টান ভোলা যায় না, নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে রবিবার যেন তারই এক হৃদয়স্পর্শী প্রমাণ দিলেন তিনি। পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাল আবহে নন্দীগ্রাম থানা মোড়ের বিখ্যাত চায়ের দোকানদার সুজল মাইতি ওরফে খড়াদাকে কথা দিয়েছিলেন— “আমি এরপর মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তোমার দোকানে এসে চা খাব।” আর ২০২৬-এ ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর বাংলার মসনদে বসে সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করলেন শুভেন্দু অধিকারী!
সময়টা ছিল ২০২১ সাল। নন্দীগ্রামের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনী লড়াইয়ের সময় থানা মোড়ের এই চেনা দোকানে এক কাপ চায়ের আড্ডায় বসে খড়াদার দিকে তাকিয়ে এই আত্মবিশ্বাসী প্রত্যয় প্রকাশ করেছিলেন শুভেন্দু। পাঁচ বছর পর রবিবার যখন খড়াদার দোকানে আচমকাই এসে দাঁড়াল মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়, তখন নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সুজলবাবু। কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো দূরত্ব নেই— দোকানে ঢুকে সেই আগের মতোই চায়ের অর্ডার দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আর ভাঁড়ে চুমুক দিয়েই অত্যন্ত আপনজনদের মতো খড়াদার পিঠে হাত রেখে স্মিত হাস্যে বললেন— “কথা রাখলাম ভাই!”
মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এই চারটি শব্দ শুনেই মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যান খড়াদা। চোখে নেমে আসে আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নন্দীগ্রাম থানা মোড়ে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন সুজল মাইতি। তাঁর লিকার চা ও দুধ চায়ের খ্যাতি সুবিদিত। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে এই ছোট্ট মাটির দোকানটিই ছিল ইতিহাসের বহু বাঁকবদলের সাক্ষী। লালকৃষ্ণ আডবাণী, সুষমা স্বরাজ, তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী থেকে শুরু করে রাজনীতির বহু দিকপাল এই দোকানে বসে চা খেয়েছেন। কিন্তু খড়াদার হৃদয়ে আলাদা আসন জুড়ে ছিলেন শুভেন্দুই।
নিজের প্রিয় মানুষটি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও যে পাঁচ বছর আগের একটি ছোট্ট দোকানের কথা মনে রেখেছেন, তা ভেবে এখনও গর্বে বুক ভরে উঠছে খড়াদার। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বললেন— “উনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সাধারণ এই মানুষের কথা মনে রেখেছেন, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব ও পরম সৌভাগ্য।” আর এই আকাশছোঁয়া আনন্দের বহিঃপ্রকাশ খড়াদা একা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দোকান থেকে রওনা হতেই খড়াদা ঘোষণা করে দেন— আজ সারাদিন দোকানে যত ক্রেতা আসবেন, কাউকেই কোনো দাম দিতে হবে না; সবাইকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চা খাওয়াবেন তিনি!
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে শুভেন্দু অধিকারীর এই চায়ের দোকানে ফিরে আসা নিছক কোনো রাজনৈতিক জনসংযোগ নয়; এ হলো মাটির মানুষের সাথে মাটির নেতার এক অটুট আত্মিক বন্ধন। ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেও যিনি শেকড় ভোলেন না, নন্দীগ্রামের খড়াদার দোকানে বসে দেওয়া কথা রাখা যেন আরও একবার প্রমাণ করল— কেন শুভেন্দু অধিকারী আমজনতার কাছে কেবল এক প্রশাসনিক প্রধান নন, ঘরের মানুষ!