বিগত সরকারের জমানায় পাহাড়প্রমাণ শিক্ষা দুর্নীতি ও নিয়োগ কেলেঙ্কারির তদন্তে এবার সরাসরি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারের দাবি তুলে বঙ্গ রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল! আদালতের নির্দেশে যখন একের পর এক প্রাক্তন মন্ত্রী, আমলা ও মধ্যস্থতাকারীরা শ্রীঘরে দিন কাটাচ্ছেন, তখন মন্ত্রিসভার শীর্ষনেত্রী তথা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে সমস্ত দায় ঝেড়ে ফেলতে পারেন— সেই প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যেই তোপ দাগলেন তিনি। দেশের হেভিওয়েট প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীদের দুর্নীতির দায়ে জেল খাটার উদাহরণ টেনে অগ্নিমিত্রা সাফ জানিয়ে দিলেন— আইনের চোখে সবাই সমান, তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও অবিলম্বে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা উচিত!
শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্টভাবে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার নীতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন— মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সেই সময় সমগ্র রাজ্য প্রশাসনের মাথায় বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিক্ষাদপ্তর থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভার প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাঁর অনুমোদন ছাড়া এক পা-ও এগোয়নি। পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শিক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্তারা যখন কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিচ্ছিলেন, তখন প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই চরম অন্যায়ের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না!
দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উদাহরণ তুলে ধরে অগ্নিমিত্রা পাল চাঁচাছোলা ভাষায় বলেন— “আমি আগেও বলেছিলাম, আজও বলছি— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করতেই হবে। তাঁকে পুলিশি বা সিবিআই হেফাজতে নিয়ে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের যদি পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে জেল হতে পারে, প্রয়াত জয়ললিতার যদি সাজা হতে পারে, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের যদি তিহাড়ে দিন কাটাতে হতে পারে— তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে আইনি ছাড় থাকবে কেন? আপনি, আমি কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— কেউই তো ভারতের সংবিধান ও আইনকানুনের ঊর্ধ্বে নন! তবে তাঁর বিরুদ্ধে কেন তদন্তকারী সংস্থাগুলি চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে না? সিবিআই এবং আদালত অবিলম্বে এই মামলার গভীরে গিয়ে আসল সত্য সামনে আনুক।”
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে মমতার সাম্প্রতিক অবস্থান ও বিক্ষোভকেও একহাত নেন পুরমন্ত্রী। তিনি কটাক্ষ করে বলেন— গণতন্ত্রে যে কারও সভা করার বা প্রতিবাদ জানানোর অধিকার আছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও তা রয়েছে। কিন্তু বাংলার সচেতন মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তাঁকে ও তাঁর দলকে সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে রাজ্যজুড়ে দুর্নীতি, কাটমানি এবং চরম ঔদ্ধত্যের যে অপসংস্কৃতি তাঁরা কায়েম করেছিলেন, তা থেকেই তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। আর সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভের পরিণতিতেই বাংলায় এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে।
অগ্নিমিত্রার সাফ বক্তব্য— “বাংলার মানুষ কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেন না। তাঁরা পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করতে সময় নেন। কিন্তু একবার যখন তাঁরা কোনো স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে ফেলেন, তখন শত প্রতিবাদ বা সভার নাটক করলেও মানুষের সেই সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের টলানো সম্ভব নয়।” ক্ষমতা হারানোর পর রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে মরিয়া বিরোধীদের যখন একদিকে দিশাহারা অবস্থা, ঠিক তখনই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারি চেয়ে বিজেপি মন্ত্রীর এই বেনজির আক্রমণ রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন পারদ চড়িয়ে দিল!