“যেখানে খুশি মসজিদ হলে মন্দিরও হবে, হাত দিলে পা ভেঙে দেব!”নৈহাটিতে কালীপুজো বন্ধের চেষ্টায় বিধায়কের চরম হুঁশিয়ারি !

আলোর উৎসবের প্রাক্কালে উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চল নৈহাটিতে ধর্মীয় অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা নিয়ে বাঁধল চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাত! পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি প্রাচীন কালীপুজোকে পুনরায় চালু করাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল নৈহাটির কারিগরপাড়া এলাকা। অভিযোগ— মুসলিম অধ্যুষিত ওই এলাকায় মাত্র দুই ঘর হিন্দু পরিবার যখন দীর্ঘ কয়েক বছর পর ফের মা কালীর আরাধনা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন, তখনই স্থানীয় কংগ্রেস নেতা মুহাম্মদ আমিনের নেতৃত্বে সেই পুজো আয়োজনে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করা হয়। আর সেই সংঘাতের খবর চাউর হতেই মধ্যরাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন নৈহাটি ও বীজপুরের দুই বিজেপি বিধায়ক। সরাসরি পুজো চালু করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বিরোধীদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যেই চরম হুঁশিয়ারি ছুড়ে দেন তাঁরা।

ঠিক কী ঘটেছিল নৈহাটির কারিগরপাড়ায়? স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে— কারিগরপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায় মাত্র দুটি সনাতনী হিন্দু পরিবারের বসবাস। দীর্ঘ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত সেখানে একটি শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের জমানায় নানাবিধ সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে একসময় সেই পুজো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছর রাজনৈতিক পালাবদলের পর সাহস সঞ্চয় করে স্থানীয় সেই সংখ্যালঘু হিন্দু বাসিন্দারাই পাড়ার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সহযোগিতায় পুনরায় পুজোটি চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু মণ্ডপ ও পুজোর প্রস্তুতি শুরু হতেই সেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির একাংশ এবং বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা মুহাম্মদ আমিন প্রকাশ্যেই আপত্তি ও বিরোধিতা শুরু করেন বলে অভিযোগ। মুহূর্তের মধ্যে বচসা গড়ায় তীব্র উত্তেজনায়, বন্ধের মুখে দাঁড়িয়ে যায় পুজো।

খবর পেয়েই বুধবার গভীর রাতে কারিগরপাড়ায় উপস্থিত হন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং বীজপুরের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। বিশাল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতেই দুই বিধায়ক রুখে দাঁড়ান এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— কোনো পরিস্থিতিতেই পুজো বন্ধ করা চলবে না। সেখানে দাঁড়িয়েই বীজপুরের বিধায়ক সুদীপ্ত দাস অত্যন্ত কড়া মেজাজে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন— “এই দেশ যদি ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার হয়, তবে যেখানে খুশি মসজিদ যেমন গড়ে উঠতে পারে, ঠিক তেমনই হিন্দুরা তাঁদের মন্দির ও পুজোও যেখানে খুশি করতে পারেন। কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এরপরও যদি ভুলেও কেউ সেই পুজোতে বাধা দেয় বা মন্দির ভাঙার দুঃসাহস দেখায়, তবে প্রশাসন তো বটেই, প্রয়োজনে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হবে!” একই সাথে বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার নেতা আখতার আলী সেখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন— “এই পুজো হবেই। আমি নিজে সংখ্যালঘু হয়েও এখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মা কালীর পুজো সম্পন্ন করব।”

পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। ফেসবুক পোস্টে তিনি চাঁচাছোলা ভাষায় লেখেন— “নৈহাটির কারিগরপাড়ায় এলে বোঝা যায়, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার তকমাটা ততক্ষণই শুনতে ভালো লাগে যতক্ষণ হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি থাকে। মাত্র দুই ঘর হিন্দুর বসবাস হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে এখানে হিন্দুদের ধর্মাচরণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ আমি এবং বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় গিয়ে ওই পরিবারগুলিকে নির্ভয়ে পুজো করার সাহস দিয়ে এসেছি। বদলের বাংলায় কোনো ভয় নয়— এখানে কালীপুজো হবেই।”

ওয়াকিবহাল মহলের মতে— রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে শিল্পাঞ্চলের বহু পুজো যা আগে শাসকদলের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা এখন একে একে মুক্ত হচ্ছে। চোরবাগানের মতো অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে যেমন পুলিশ সতর্ক, তেমনই সংখ্যালঘু এলাকায় ধর্মীয় অধিকার রক্ষার এই লড়াইয়ে বিজেপি বিধায়কদের সরাসরি মাঠে নেমে পড়া নৈহাটির রাজনৈতিক সমীকরণকে এক ধাক্কায় অনেকটাই উত্তপ্ত করে তুলেছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *