দুর্গাপুজো ও বিজয়া দশমীর আবহ শেষ হতেই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। সনাতন ধর্মাবলম্বী না হলে নাকি দুর্গাপ্রতিমা স্পর্শ করা যাবে না—মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এমন বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরেই এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। শুধু তাই নয়, প্রতিমা নিরঞ্জনে কারা অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের নাম ও পরিচয় জানানোর যে অদ্ভুত দাবি তিনি তুলেছেন, তাকে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বিভাজকমূলক মানসিকতা বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা কুণাল ঘোষ। তাঁর স্পষ্ট কথা, পুজোর আনন্দ ও মিলনের উৎসবেও বিজেপি ধর্মের দেওয়াল তোলার নোংরা রাজনীতি শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ্যমন্ত্রীকে একহাত নিয়ে কুণাল ঘোষ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন, বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে হিন্দু ধর্মের প্রকৃত অর্থ বা সংজ্ঞা বুঝতে হলে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কিংবা শ্রীচৈতন্যের উদার ভাবাদর্শকে স্মরণ করা উচিত। শুভেন্দু অধিকারীর এই ধরনের মন্তব্য বাংলার সেই মহান ও ঐতিহ্যশালী সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলা তথা গোটা ভারতের মাটিতে মায়ের পুজো মানেই জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের একসঙ্গে মেতে ওঠা। মায়ের আশীর্বাদ পাওয়ার অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে। অথচ সেখানে দাঁড়িয়ে কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই প্রতিমা স্পর্শ করতে পারবেন—এমন দাবি বাংলার মনীষীদের আদর্শের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না।
কটাক্ষের সুরে তৃণমূল বিধায়ক আরও বলেন, এই ধরনের কথা শুনলে মনে হয় যেন বাংলার মাটিতে এই প্রথমবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমান বিজেপি নেতৃত্ব এবং তাদের দলের নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য প্রতিমা বিসর্জনের মতো একটি আবেগময় ও মিলনের মুহূর্তেও কৃত্রিম ভেদাভেদ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। আসলে রাজ্য সরকারের বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচার চালিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জমি শক্ত করতে না পেরে, এখন এসব অবাস্তব ও উসকানিমূলক কথা বলে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি।
শাস্ত্রীয় ও ব্যবহারিক দিক তুলে ধরে কুণাল ঘোষ খুব জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলেছেন যে, বিসর্জনের ঘাটে দাঁড়িয়ে কে প্রতিমা স্পর্শ করবে আর কে করবে না, তা কি এখন থেকে জাত-পাত বা ধর্মের পরিচয়পত্র দেখে বিচার করা হবে? তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট আচারের মাধ্যমেই ঘট বিসর্জন ও প্রতিমার প্রাণবিসর্জনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর নদী বা গঙ্গার জলে মূলত সেই কাঠামোই বিসর্জন দেওয়া হয়। সেখানে এমন সংকীর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং নিন্দনীয়। সব মিলিয়ে, বিজেপির এই উসকানিমূলক ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে শাসকদলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, যা নিয়ে এখন রাজ্য রাজনীতিতে বইছে প্রতিবাদের ঝড়!
বিরোধী দলের কথায় বাংলার মাটি থেকে সম্প্রীতির এই শেকড় কোনো দিনই উপড়ে ফেলতে পারবে না কেউ। ধর্মের নামে এই সংকীর্ণ রাজনীতিকে বাংলার সচেতন মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। উৎসবের মেলবন্ধনে চিড় ধরাবার যেকোনো চক্রান্ত রুখে দিতে প্রস্তুত এ রাজ্যের জনতা। সমস্ত উসকানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আগামী দিনেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেবে এই বাংলা!
