ঠিক যেন বলিউড ক্রাইম থ্রিলারের টানটান চিত্রনাট্য! শৌচালয়ে যাওয়ার ছুতোয় পুলিশের গাড়ি থামানো, চোখের পলকে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের সার্ভিস রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে সরাসরি তিন রাউন্ড গুলি বর্ষণ এবং আত্মরক্ষার্থে জখম পুলিশকর্মীর পুকুরে ঝাঁপ! আর তার ঠিক পরেই পুলিশের পালটা গুলিতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এক নারকীয় ধর্ষণ ও খুনের মূল অভিযুক্তের জীবন! সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর এনকাউন্টারের ঘটনা কেবল অপরাধ জগতকেই কাঁপিয়ে দেয়নি, রাজ্যবাসীকে আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সেই অতি-পরিচিত ও বহুল চর্চিত ডায়লগ— “দিনে জমা, আর রাতে খরচ!”
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার সকালে। গাইঘাটা থানা এলাকার একটি জনবিরল বাড়ির পেছন থেকে উদ্ধার হয় এক নাবালিকার ক্ষতবিক্ষত ও অর্ধনগ্ন নিথর দেহ। উৎসবের আমেজে মায়ের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিল ওই নাবালিকা। কিন্তু তারপর থেকেই হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় সে। ঘণ্টাখানেকের খোঁজাখুঁজির পর যখন তার দেহ মেলে, তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা এলাকা। পরিবারের লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে এক যুবককে মূল অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করে গাইঘাটা থানার পুলিশ। তার বিরুদ্ধে নাবালিকাকে অপহরণ, পাশবিক নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে খুনের মামলা রুজু হয়।
তদন্তের স্বার্থে সোমবার বিকেলে পুলিশি প্রহরায় ধৃতকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অপরাধস্থল গাইঘাটায়, অপরাধের ঘটনার হুবহু পুনর্নির্মাণ বা ক্রাইম সিন রিক্রিয়েশন করতে। পুনর্নির্মাণ সেরে অভিযুক্তকে প্রিজন ভ্যানে তুলে যখন থানায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল, তখনই রচিত হয় পলায়নের মারাত্মক ছক। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী— পথিমধ্যে অভিযুক্ত বারবার দাবি করে তার প্রবল প্রস্রাব পেয়েছে এবং শৌচালয়ে না গেলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। মানবিকতার খাতিরে পুলিশকর্মীরা নির্জন রাস্তার পাশে গাড়িটি থামান এবং তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামামাত্রই চরম আগ্রাসী রূপ নেয় ওই ধর্ষক। মুহূর্তের মধ্যে এক পুলিশ আধিকারিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর কোমর থেকে সার্ভিস রিভলবারটি ছিনিয়ে নেয় সে। হতচকিত পুলিশকে কোনো সুযোগ না দিয়ে অত্যন্ত কাছ থেকে পুলিশকর্মীদের লক্ষ্য করে পর পর ৩ রাউন্ড এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে অভিযুক্ত। বুলেটের আঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মী রাস্তার পাশের পুকুরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হন এবং গুরুতর চোট পান। এমন চরম প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে গাড়িতে থাকা অন্য পুলিশ আধিকারিকরা আত্মরক্ষার্থে নিজেদের সার্ভিস অস্ত্র থেকে পালটা গুলি চালান। পুলিশের সেই গুলিতে অভিযুক্তের পা ও শরীরের একাধিক জায়গা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। তড়িঘড়ি তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বাংলায় ক্ষমতার পালাবদলের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নারী সুরক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অতীতে বহু জনসভা থেকেই তিনি কড়া সুরে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন— নারী নির্যাতনকারী ও দুষ্কৃতীদের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসন কোনো নরম মনোভাব দেখাবে না। গাইঘাটার এই এনকাউন্টার যেন প্রশাসনিকভাবে সেই কড়া মনোভাবেরই সরাসরি প্রতিফলন।
নাবালিকার নৃশংস মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তের এমন পরিণতি একদিকে যেমন এলাকায় ন্যায়বিচারের স্বস্তি ফিরিয়েছে, তেমনই পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে তার ফল কী হতে পারে— গাইঘাটার রাজপথে সেই চরম বার্তাই দিল রাজ্য প্রশাসন!