নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে নাম ও নির্বাচনী প্রতীক ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই ক্ষত শুকোনোর আগেই এবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মেটিয়াবুরুজে আছড়ে পড়ল এক বিশাল সাংগঠনিক সুনামি! আসন্ন উপনির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে খাস মেটিয়াবুরুজের মাটিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে কার্যত ফাঁকা করে দিয়ে একযোগে দল ছাড়লেন প্রায় এক হাজার সক্রিয় তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, এআইসিসির পশ্চিমবঙ্গ পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কংগ্রেস সভাপতি মহম্মদ মোক্তারের উপস্থিতিতে তৃণমূলের সেই কর্মীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নিলেন জাতীয় কংগ্রেসের তিরঙ্গা পতাকা।
মেটিয়াবুরুজের এই মেগা যোগদান সমাবেশকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ শহরতলির রাজনৈতিক উত্তাপ এক ধাক্কায় শিখরে পৌঁছেছে। এক হাজার কর্মীর কংগ্রেসের পতাকা তুলে নেওয়ার এই দৃশ্য প্রমাণ করে দিল— সংখ্যালঘু বলয় হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলেও মমতা শিবিরের পায়ের নিচের মাটি এখন সম্পূর্ণ সরে গিয়েছে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সদ্য দলত্যাগীদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিয়ে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক তোপ দাগেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী মিলন প্রধানের বর্তমান পরিস্থিতির কথা টেনে এনে অত্যন্ত ঝাঁঝালো সুরে শুভঙ্কর সরকার বলেন— “আজ মিলন প্রধানের সঙ্গে যা করা হচ্ছে, তা আসলে প্রকাশ্য দিবালোকে গণতন্ত্রকে হত্যা করার শামিল! এরা এতদিন সাধারণ মানুষের ভোট চুরি করেছে, আর আজ ক্ষমতায় টিকে থাকতে নির্বাচন কমিশনের সামনে গিয়ে প্রতীক পর্যন্ত চুরি করার নোংরা খেলায় নেমেছে।” তৃণমূল কর্মী উপাসনার ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনারও তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি সাফ বার্তা দেন— রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর যে চরম দমনপীড়ন চলছে, সাধারণ মানুষ তার পাই টু পাই হিসাব রাখছে। এই অত্যাচারী শক্তিকে ভোটের বাক্সে গণতান্ত্রিক পথেই উচিত শিক্ষা দিয়ে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হবে।
একই সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশীর গলাতেও। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন— সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের দিনগুলিতে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন মিলন প্রধান। কিন্তু আজ উপনির্বাচনের মুখে মিলন প্রধানকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রকাশ জোশী স্পষ্ট অভিযোগ করেন— নন্দীগ্রামের মাটিতে মিলন প্রধানের বিপুল গণভিত্তি এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে শাসক ও বিরোধী শক্তি। প্রথমে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করার চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল; কিন্তু মিলন প্রধান মেরুদণ্ড সোজা রেখে মাথা নত না করায় পরিকল্পিত চক্রান্ত করে তাঁকে জেলে ঢোকানো হয়েছে। তবে তিনি শারীরিকভাবে শ্রীঘরে বন্দি থাকলেও নন্দীগ্রামের আমজনতার মন ও অন্তরে মিলন প্রধানই একমাত্র বিকল্প হিসেবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
মেটিয়াবুরুজের এই ঐতিহাসিক গণ-যোগদান দক্ষিণ ২৪ পরগনায় কংগ্রেসের দুর্বল হয়ে পড়া সংগঠনকে যেমন নতুন সঞ্জীবনী সুধা এনে দিল, তেমনই উপনির্বাচনের মহারণে নামার আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরের ফাটলকে প্রকাশ্য রাজপথে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। প্রতীকহীন, দিশাহীন মমতা শিবিরের এই রক্তক্ষরণ আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের ব্যালট বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার!
