আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে ফের বড় সম্মান ভারতের। ইউরোপ সফরের অংশ হিসেবে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সুইডেনের গোথেনবার্গ শহরে পৌঁছালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর সেখানেই দেখা গেল এক বিরল কূটনৈতিক মুহূর্ত। প্রোটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে হাজির হন সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও বিদেশি রাষ্ট্রনেতার জন্য এই ধরনের ব্যক্তিগত উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিশেষ সম্মানের প্রতীক। শুধু মাটিতেই নয়, আকাশপথেও ছিল রাজকীয় অভ্যর্থনা। সুইডেনের অত্যাধুনিক ‘গ্রিপেন’ যুদ্ধবিমান মোদীর বিমানকে মাঝআকাশে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে গোথেনবার্গ বিমানবন্দর পর্যন্ত এসকর্ট করে নিয়ে আসে।
এরপর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে হয় গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ভারত ও সুইডেন তাদের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ”-এর মর্যাদায় উন্নীত করার ঘোষণা করে। গ্রিন ট্রানজিশন, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, শিল্প বিনিয়োগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই সফরের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত আসে তখনই, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে তুলে দেওয়া হয় সুইডেনের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, ‘রয়্যাল অর্ডার অফ দ্য পোলার স্টার কমান্ডার গ্র্যান্ড ক্রস’।
১৭৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী সম্মান সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও অসামান্য জনসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়। বিদেশি সরকার প্রধানদের ক্ষেত্রে এটিই সুইডেনের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। উল্লেখযোগ্যভাবে, এটি নরেন্দ্র মোদীর প্রাপ্ত ৩১তম আন্তর্জাতিক সম্মান, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী মোদী জানিয়েছেন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভবিষ্যতে দুই অঞ্চলের শিল্প ও বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ভারত ও সুইডেনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে ২৮০-র বেশি সুইডিশ সংস্থা ভারতে ব্যবসা করছে, অন্যদিকে ৭৫টিরও বেশি ভারতীয় কোম্পানি সফলভাবে কাজ করছে সুইডেনের বাজারে। আর এই সফর ঘিরে উচ্ছ্বাস ছিল প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ইউরোপের মাটিতে উঠে আসে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের রঙিন ছবি। সুইডেন সফরে কূটনৈতিক সম্মান, আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং অর্থনৈতিক বার্তা সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদীর এই ইউরোপ সফর যে ভারতের বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও শক্ত ভিত দিল, তা বলাই যায়।