শারদোৎসবের মহা সপ্তমীর রাতে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের সেই অভিশপ্ত পদপিষ্টের ঘটনা যেন গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিয়েছিল ১৯টি তরতাজা প্রাণের অকাল মৃত্যুতে। শোকের সেই কালো মেঘ কাটিয়ে বাংলার নিহত প্রতিটি পরিবারের দুয়ারে নিজে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু মানবিকতার যে কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা রাজ্যের গণ্ডি হয় না, ফের একবার তা প্রমাণ করে দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ভিনরাজ্য অর্থাৎ বিহারের মুজফ্ফরপুরের নিহত পিতা ও শিশুপুত্রের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মোট ৫০ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতার আলোকোজ্জ্বল পুজো দেখতে বিহার থেকে এসে চোরবাগানের ভিড়ের চাপে প্রাণ হারিয়েছিলেন মুজফ্ফরপুরের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী অভিষেক শ্রীবাস্তব এবং তাঁর মাত্র ৭ বছরের নিষ্পাপ পুত্র অংশ শ্রীবাস্তব। একই পরিবারের দুটি প্রজন্মের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণে কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল পরিবারটি। এই খবর পাওয়ার পরেই স্বজনহারা পরিবারটির সাথে যোগাযোগ করে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বিধায়ক তথা মন্ত্রী উমেশ রাই সরাসরি মুজফ্ফরপুরে ওই পরিবারের বাসভবনে পৌঁছন। সেখানে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের হাতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা করে দুটি চেকে মোট ৫০ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
চেক হস্তান্তরের সেই আবেগঘন মুহূর্তে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভিডিও কলের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলেন নিহত অভিষেকবাবুর দিদি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে। মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত বেদনার সুরে তাঁদের আশ্বস্ত করে জানান— “যাঁরা চলে গিয়েছেন, সেই ভাই এবং নিষ্পাপ ভাইপোকে হয়তো আমরা আর ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু এই চরম শোকের দিনে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আপনাদের পরিবারের পাশে পরিবারের সদস্যের মতোই আজীবন দাঁড়িয়ে থাকবে।” মুখ্যমন্ত্রীর এই সহমর্মিতা ও অপ্রত্যাশিত সহায়তায় কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবারটি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও শুভেন্দু অধিকারীর প্রতি তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পরপরই প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কিন্তু বিহারের বাসিন্দা হওয়ায় তাঁদের পক্ষে বাংলায় চাকরি করা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই বিষয়টি ওঠে আসে আলোচনায়। পরিবারের তরফ থেকে অনুরোধ জানানো হয়— বিহারেই যদি তাঁদের পরিবারের কোনো সদস্যকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তৎক্ষণাৎ তাঁদের আশ্বাস দিয়ে জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলে সে রাজ্যে একটি চাকরির সুরাহা করার আন্তরিক চেষ্টা করবেন। একই সাথে মন্ত্রী উমেশ রাইকে নির্দেশ দেন, যাতে এই ৫০ লক্ষ টাকার চেকটি কোনো জটিলতা ছাড়াই অবিলম্বে পরিবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সম্পূর্ণভাবে ট্রান্সফার হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে।
উৎসবের আলো মিলিয়ে গিয়ে যে পরিবারগুলির জীবনে চিরতরে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার, সেই ক্ষত কোনো অর্থ বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে হয়তো পুরোপুরি মোছা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে আত্মীয়ের মতো স্বজনহারাদের কাঁধে হাত রাখা এবং ভিনরাজ্যের সীমানা পেরিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ বুঝিয়ে দিল— বিপদে মানুষের পাশে থাকাই সুশাসনের আসল অগ্রাধিকার!