বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে কিছু ইসলামপন্থী সংগঠনের প্রতিবাদ, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে আলোচনা, এই পরিস্থিতির মধ্যেই সংসদে এক বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “হিন্দুরা ৮১ ফুটের রামমূর্তি বানাচ্ছে। যারা ধর্মের ব্যবসা করেন, তারা প্রতিদিন মিছিল করে কাফেরদের দেশ ছাড়ার দাবি জানাচ্ছেন। আমি একজন মুসলমান হয়ে কেন এতে বিরক্ত হব? আমি আমার মসজিদে নামাজ পড়ি, তারা তাদের মন্দিরে পূজা দেয়। তারা মাত্র ৯ শতাংশ। এটা কি তাদের দেশ নয়?”
এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন,
“৮১ ফুট কেন, ৩০০ ফুটের মূর্তি হোক। তাতে আমাদের কী এসে যায়?” এই বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, একজন মুসলমানের ধর্ম পালনে যদি অন্য ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় বা ধর্মীয় স্থাপনা কোনো বাধা সৃষ্টি না করে, তাহলে সেই ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো উচিত। এদিকে রামমূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে কয়েকটি ইসলামপন্থী সংগঠন বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে। তাদের দাবি, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এমন বিশাল মূর্তি নির্মাণ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিছু প্রতিবাদে উস্কানিমূলক স্লোগানও শোনা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের একাংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তাঁদের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। তাঁদের বক্তব্য, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের ইতিহাসও বলে, বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে। দেশের নানা অঞ্চলে আজও ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা কিংবা বড়দিন সব উৎসবেই পারস্পরিক অংশগ্রহণের ঐতিহ্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ধর্মীয় সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার ওপর। কারণ একটি দেশের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষায় নয়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত।