দিল্লির আবগারি কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়ার ঘটনার সাক্ষী সকলেই। যার জেরে তিহাড় জেল ঘুরে এসেছেন দিল্লির বাঘা বাঘা নেতারা। কিন্তু এবার সেই একই অভিযোগ বাংলাতেও! এ রাজ্যে আবগারি নীতিকে হাতিয়ার করে এবার কোটি কোটি টাকার এক মহাসিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস। আর কাঠগড়ায় বিদায়ী শাসকদলের সেই অতি পরিচিত শীর্ষ নেতৃত্ব। না, অভিযোগটা নতুন নয়, কিন্তু এর শিকড় অনেক গভীরে। সম্প্রতি রাজ্যের প্রবীণ বিজেপি সাংসদ তাপস রায় এই নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন। যদিও গল্পের শুরুটা হয়েছিল ২০১৭ সালে। সে সময় হঠাৎ করেই রাজ্যের আবগারি নীতিতে এক জাদুকরী পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কিন্তু কেন করা হয়েছিল সেই পরিবর্তন? সুরাপ্রেমীদের সুবিধার জন্য, নাকি পকেট ভরার জন্য?
অভিযোগ উঠছে, ওই পরিবর্তনের আড়ালে মদ ও বিয়ার উৎপাদনকারী সংস্থা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর এক অলিখিত, অতিরিক্ত লেভি বা ‘আর্থিক চাঁদা’ চাপানো হয়েছিল। আর সেই ‘তোলাবাজি’র ফর্মুলা ছিল ভারী চমৎকার— প্রতি বোতলে নাকি একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা সোজা চলে যেত সে সময়ের শাসকদলের যুবরাজের ঘরে। কোটি কোটি টাকার সেই বিপুল খেলা নাকি চলেছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। বিজেপি সাংসদ তাপস রায় এদিন সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, এই টাকা সংগ্রহের জন্য দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এলাকা ক্যামাক স্ট্রিটে এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় ‘সিন্ডিকেট’গড়ে উঠেছিল। ছোট ব্যবসায়ী থেকে বড় ডিস্ট্রিবিউটর— সবাইকে নাকি সেই সিন্ডিকেটের ‘ট্যাক্স’ চুকিয়ে তবেই বাংলায় ব্যবসা করতে হতো। তৃণমূলের শীর্ষ স্তরে নাকি এই টাকা পৌঁছানোর এক নিখুঁত রুট ম্যাপ তৈরি করা হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগের চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিলমোহর এখনও পড়েনি, কিন্তু ধোঁয়া যখন উঠছে, তখন আগুন যে লেগেছে তা বলাই বাহুল্য!
আসলেই গরুর গাড়ি করে কয়লা পাচার হোক, কিংবা বস্তা বন্দি চাকরি বিক্রি— তৃণমূল জমানায় কেলেঙ্কারির তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। আর এবার সেই লিস্টে জুড়ে গেল ‘মদ’ তথা আবগারি নীতি। রাজনৈতিক মহলের একাংশ টিপ্পনি কেটে বলছেন, মা-মাটি-মানুষের সরকার শেষমেশ নাকি ‘মদ-মাটি-মানুষের’ সরকারে পরিণত হয়েছিল! যে রাজ্যে DA চাইলে ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যায়, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ৫০০-১০০০ টাকা দিতে কোষাগার টান পড়ে, সেই রাজ্যেই আবগারি নীতি বদলে নেতাদের পকেট উপচে পড়ছে কোটি কোটি টাকায়! কিন্তু এই টাকা কার? সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা নয় কি?
এদিকে এই ইস্যু সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি রাজ্যের আবগারি নীতিকে ব্যবহার করে বড় ধরনের আর্থিক দুর্নীতি করেছে তৃণমূল এবং তার ফায়দা লুটত অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। বিজেপি নেতা তাপস রায় এই প্রসঙ্গে রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তের দাবি তুলেছেন। যদিও অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই রাজ্যের একাধিক দুর্নীতির তদন্ত করছে। জেলে দিন কাটাচ্ছেন প্রাক্তন মন্ত্রী থেকে শুরু করে বহু বাঘা নেতারা। আর এবার ক্যামাক স্ট্রিটের ওই সিন্ডিকেটের সুতো ধরে টানলে ঠিক কোথায় টান পড়বে এখন সেটাই দেখার।
