বিজেপি জমানার তথাকথিত ‘স্বচ্ছ’ রাজনীতির মুখোশ খুলে গিয়ে আসল কঙ্কালসার চেহারাটা আবারও রাজপথে বেরিয়ে পড়ল! ক্ষমতার দম্ভ আর দুর্নীতি যে বিজেপির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে, তার জোরালো প্রমাণ মিলল আরও একবার। টালিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর সদ্যপ্রাক্তন আপ্তসহায়ক সায়ন্তন সান্যালকে ১৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা মারাত্মক আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করেছে বর্ধমান থানার পুলিশ। সোমবার ভোররাতে উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল থানার শ্যামনগরের ব্যানার্জিপাড়া রোডের বাড়ি থেকে পুলিশি জালে ধরা পড়েছে বিজেপি বিধায়কের এই ঘনিষ্ঠ সায়ন্তন। বর্ধমান সিজেএম আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তাকে ২ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনার বিবরণ থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে যে, বিজেপি বিধায়কের এই পিএ সায়ন্তন সান্যাল পেশায় একজন ঠিকাদার। ঠিকাদারি কাজের সূত্রেই তার পরিচয় হয় রায়না থানার সেহারাবাজারের বাসিন্দা তথা রেলের ঠিকাদার বিশ্বরূপ সাহার সঙ্গে। বিধায়কের পিএ হওয়ার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এবং একই পেশায় থাকার ভান করে বিশ্বরূপবাবুর সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে সে। সেই সম্পর্কের ফাঁদ পেতে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দফায় দফায় বিশ্বরূপবাবুর কাছ থেকে মোট ২৫ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা ধারে নেয় এই সায়ন্তন!
টাকা ফেরতের সময় এলে মাত্র ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মিটিয়ে বাকি ১৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে সায়ন্তন পালিয়ে বেড়াতে শুরু করে। এমনকি চলতি বছরের ১৭ মার্চ সায়ন্তন ভুক্তভোগীকে ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে দাবি করে যে তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে বিশ্বরূপবাবুর অ্যাকাউন্টে একটি ফুটি কড়িও জমা পড়েনি! একের পর এক অছিলায় ধোঁকা দেওয়ার পর বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন বিশ্বরূপ সাহা। আদালতের কড়া নির্দেশে তদন্তে নেমে বর্ধমান থানার পুলিশ শেষ পর্যন্ত এই বিজেপি বিধায়কের পিএ-কে টেনে-হিঁচড়ে গ্রেফতার করেছে।
তবে আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া! পিএ ধরা পড়তেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে তিনি দাবি করছেন যে, “পুজোর আগেই নাকি তিনি সায়ন্তনকে সরিয়ে দিয়েছিলেন”। যদি সায়ন্তন দুর্নীতিগ্রস্তই হয়ে থাকে, তবে এতদিন ধরে তার এই জালিয়াতি কারবার কেন আড়াল করে রাখা হলো? নির্বাচনের সময় থেকে যাকে ছায়ার মতো পাশে রাখা হলো, ধরা পড়তেই তাকে ছাঁটাইয়ের গল্প শোনানো হচ্ছে কেন? পাপিয়া অধিকারী স্বীকার করেছেন যে তাঁর পিএ-র বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ছিল। তা সত্তেও এই নোংরা চক্রান্ত ও তোলাবাজি চক্রে আরও কে কে জড়িত, সেই বিষয়ে এখন জোর তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
ক্ষমতা ও ক্ষমতার বলয়ে থাকা একশ্রেণির নেতার ছত্রছায়ায় চলা এই ধরনের আর্থিক জালিয়াতি ও প্রতারণার চক্র যে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। শাসক দলের অন্দরের এই দুর্নীতি ও অপরাধের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা তদন্তে আর কী কী চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে, এখন সেটাই দেখার।