দুর্গাপুজো বরাবরই বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই উৎসবের গুরুত্ব শুধুমাত্র সামাজিক বা ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও দুর্গাপুজো এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজেপি এখন দুর্গাপুজোকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
গত ২০২৫ সালে দিল্লির বাঙালি পাড়ায় পুজো কাটিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। আর ২০২৬-এ দুর্গাপুজোর আসল ‘মক্কা’ কলকাতায় প্রধানমন্ত্রীর আসা নিয়ে ইতিমধ্যেই আমবাঙালির মধ্যে পুজো নিয়ে পারদ চড়তে শুরু করেছে। রাজ্যে প্রথমবার বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর, এবারের দুর্গাপুজোকে এক সম্পূর্ণ অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে চাইছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
বাংলার মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে গেলে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিতেই হবে। আর সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক হল দুর্গাপুজো। তাই উৎসবকে ঘিরে দলের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়াকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কৌশল নয়, সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরির প্রচেষ্টাও বলা যেতে পারে। এবারের দূর্গাপুজোকে তাই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি সরকার।
গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক শীর্ষ নেতা দুর্গাপুজো নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও বিভিন্ন সময়ে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে দুর্গাপুজোকে ঘিরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বাড়তি আগ্রহ অনেকের নজর কেড়েছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও বিজেপি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ UNESCO-র স্বীকৃতির পর এই উৎসবের বিশ্বজোড়া পরিচিতি বেড়েছে। এখন যদি দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
বিজেপির কাছে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। প্রতি বছর পুজোকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। ছোট ব্যবসায়ী, শিল্পী, কারিগর, আলোকসজ্জা শিল্পী থেকে শুরু করে পর্যটন শিল্প সবাই এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে পুজোর গুরুত্ব বাড়ানো মানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও উৎসাহ দেওয়া।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলায় নিজেদের সংগঠন আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বিজেপি। সেই কারণে মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুর্গাপুজোকে গুরুত্ব দেওয়া দলের কাছে স্বাভাবিক পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে অনেকেই মনে করেন, দুর্গাপুজোর মূল শক্তি তার সর্বজনীন চরিত্রে। এই উৎসব সব ধর্ম, মত এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের মিলনক্ষেত্র। তাই উৎসবকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার উদ্যোগ স্বাগত হলেও তার অরাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই প্রত্যাশাও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন , বিজেপি এখন দুর্গাপুজোকে শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক উৎসব হিসেবে নয়, ভারতের সাংস্কৃতিক শক্তির অন্যতম প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেই কারণেই উৎসবকে ঘিরে বাড়ছে কেন্দ্রীয় আগ্রহ, বাড়ছে আলোচনা এবং বাড়ছে প্রত্যাশা। আগামী কয়েক বছরে দুর্গাপুজোকে ঘিরে আরও বড় জাতীয় উদ্যোগ দেখা গেলে তা খুব একটা অপ্রত্যাশিত হবে না।