বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে ভারতের সাংস্কৃতিক প্রভাব ও রাষ্ট্রনেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা আবারও প্রমাণ হলো। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হওয়ার ঠিক আগেই, এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মুহূর্তে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে একটি বিশেষ উপহার তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। না, উপহারটি সাধারণ কোনো স্মারক নয়, এটি হলো প্রাচীন ভারতীয় তামিল সাহিত্যের প্রবাদপ্রতীম অমূল্য রত্ন—’তিরুক্কুরল’। যদিও এই প্রথম নয়, ভারত যে বহুমাত্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির এক মহামিলনক্ষেত্র, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্ব রাষ্ট্রনেতাদের সামনে বরাবরই তা সগর্বে তুলে ধরেছেন। তবে, এই বিশেষ উপহারে মূল তামিল শ্লোকের পাশাপাশি রয়েছে বিখ্যাত অনুবাদক নাইরা মকরচিয়ানের করা রুশ অনুবাদ। পুতিনের হাতে এই ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী রুশ প্রেসিডেন্টকে এই গ্রন্থের অসীম গুরুত্ব ও ভারতীয় দর্শনের গভীরতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন—কী এই ‘তিরুক্কুরল’? কেন একে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে এত চর্চা? এটি আসলে তামিল সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র একটি গ্রন্থ। যার রচয়িতা মহান সন্ত ও কবি তিরুবল্লুভর। তামিল সমাজে এই গ্রন্থের স্থান এতই উঁচুতে যে অনেকে একে ‘তামিল বেদ’ বলেও অভিহিত করেন। এতে রয়েছে মানুষের জীবনযাপন, নৈতিকতা, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রেমের গভীর বিশ্লেষণ। সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় হলো—সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই রাশিয়ায় ভারতীয় দর্শনের চর্চা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এই তিরুক্কুরল বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় পৌঁছালে রুশ পন্ডিতদের গভীরভাবে আকর্ষণ করে। এমনকী, মহাকবি লিও তলস্তয়ের মতো বিশ্ববরেণ্য রুশ চিন্তাবিদ ও লেখকদের জীবনদর্শনেও এই গ্রন্থের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। আর সেই ঐতিহাসিক মেলবন্ধনকেই আজ নতুন রূপ দিলেন নরেন্দ্র মোদী। তিরুক্কুরলের মূল বিষয়বস্তু মূলত তিনটিভাগে বিভক্ত—
১. নৈতিকতা ও সৎ জীবনযাপন: যেখানে একজন আদর্শ মানুষের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে বলা হয়েছে।
২. সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা: যেখানে একজন দক্ষ শাসকের গুণাবলী, অর্থনীতি ও সুশাসনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
৩. প্রেম ও মানবিক সম্পর্ক: যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের মেলবন্ধন ঘটায়।
এই প্রাচীন গ্রন্থে কয়েকটি মাত্র ছোট দ্বিপদী শ্লোকের মধ্যে বিশ্ব ও জীবনের এই সকল পরম সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। আর সেই কারণেই শত শত বছর পার হয়ে গেলেও এর প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। ভারতের প্রাচীন জ্ঞান, ঐতিহ্য ও তামিল সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বনেতাদের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক অনন্য নিদর্শন। তামিলনাড়ুর এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে বিশ্বনেতা ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও একবার প্রমাণ করলেন—ভারত কেবল অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আজ বিশ্বগুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ। সেই সঙ্গে তার এই পদক্ষেপে সংস্কৃতি, কূটনীতি ও বিশ্বশান্তির এই অটুট বার্তা আজ ভারত থেকে পৌঁছে গেল ক্রেমলিন পর্যন্ত।