‘এটা মুক্ত বাংলা’, দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে এসে শিলিগুড়ির পোস্টার বিতর্কে কী বললেন মিঠুন?
দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, আনন্দ আর সম্প্রীতির উৎসব। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই উৎসবে শামিল হন আট থেকে আশি। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যি, নতুন জামার গন্ধ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষায় দিন গোনেন মানুষ। কিন্তু উৎসবের সেই আবহেই এবার সামনে এল এক নতুন বিতর্ক। পুজোর সামগ্রী কেনা থেকে বিরিয়ানি খাওয়া, সবেতেই হিন্দু দোকানকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শিলিগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় পড়েছে পোস্টার। আর সেই বিতর্কের মাঝেই মুখ খুললেন অভিনেতা তথা বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন করে চর্চা।
চতুর্থীর দিন উত্তর ২৪ পরগনার আগরপাড়ায় ‘আমরা সবাই ইয়ং ম্যানস অ্যাসোসিয়েশন’-এর দুর্গাপুজো উদ্বোধনে হাজির হন মিঠুন চক্রবর্তী। প্রিয় অভিনেতাকে সামনে থেকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন বহু মানুষ। উদ্বোধনী মঞ্চে নিজের একাধিক বাংলা ছবির জনপ্রিয় সংলাপ শুনিয়ে দর্শকদের মন জয় করেন তিনি। তাঁকে ঘিরে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। উৎসবের এই আনন্দঘন পরিবেশে যেমন ছিল তারকার উপস্থিতির উন্মাদনা, তেমনই ছিল রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই একাধিক বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন মিঠুন।
বিজেপি সরকারের আমলে প্রথম দুর্গাপুজো, কেমন অনুভূতি হচ্ছে তাঁর? এই প্রশ্নের উত্তরে মিঠুন বলেন, “এটা মুক্ত বাংলা। সেই জন্য উৎসাহ ফিরে পেয়েছি। ১২ থেকে ১৩ হাজার নতুন পুজো যোগ হয়েছে। এটাই তার প্রমাণ। সবাই আনন্দ করুক, উৎসব করুক।” তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তিনি। নতুন পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তাঁর দাবি, উৎসবের উদ্দীপনা ফিরে এসেছে। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদল ও দুর্গাপুজোর পরিবেশ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কিন্তু উদ্বোধনী মঞ্চে সবচেয়ে বেশি চর্চা তৈরি হয় শিলিগুড়ির পোস্টার বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই। সম্প্রতি শিলিগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নামে এমন কিছু পোস্টার দেখা যায়, যেখানে লেখা ছিল, ‘বিরিয়ানি খান, হিন্দু দোকানে’ এবং ‘পুজোর সামগ্রী কিনুন, হিন্দু দোকান থেকে’। অর্থাৎ, পুজোর কেনাকাটা হোক কিংবা খাওয়াদাওয়া, হিন্দু দোকানদারদের কাছ থেকেই কেনাকাটা করার আবেদন জানানো হয়েছিল। এই পোস্টার সামনে আসতেই শুরু হয় বিতর্ক। প্রশ্ন ওঠে, উৎসবের বাজারে কেনাকাটার মতো বিষয়েও ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের বার্তা দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? যে দুর্গাপুজোকে বাংলার সম্প্রীতির অন্যতম প্রতীক বলে মনে করা হয়, সেই উৎসবের আগে এমন পোস্টার স্বাভাবিকভাবেই নানা মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গেই মিঠুন চক্রবর্তীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “যে যেরকম ভাবে ভাববে, সেভাবে দেশ চলবে। ওরা যদি ভেবে থাকে, হবে।” তাঁর এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যের মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছে। পোস্টারের আহ্বানকে তিনি কীভাবে দেখছেন, কিংবা এই ধরনের প্রচারকে তিনি সমর্থন করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজের অবস্থান সংক্ষেপেই প্রকাশ করেছেন। আর সেই কারণেই তাঁর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে আসতে পারে নানা ব্যাখ্যা।
অন্যদিকে, পোস্টার ঘিরে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নেতারা জানিয়েছেন, এটি তাঁদের তরফে একটি আবেদন মাত্র। কারও উপর কোনও মত চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য তাঁদের নেই বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, মানুষ নিজের বিবেচনায় ঠিক করবেন, তাঁরা কী গ্রহণ করবেন এবং কোথা থেকে কেনাকাটা করবেন। তবে এই ব্যাখ্যার পরেও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। কারণ, বাজারে পছন্দমতো জিনিস কেনা কিংবা পছন্দের খাবার খাওয়া একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেখানে ধর্মের পরিচয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষত দুর্গাপুজোর মতো সর্বজনীন উৎসবের সময় এই বিতর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলার দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনা নয়, এ উৎসব মানুষের মিলনের, পুরনো অভিমান ভুলে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার। পাড়ার পুজোয় চাঁদা দেওয়া থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো, প্রতিমা দর্শন কিংবা উৎসবের বাজার—সব ক্ষেত্রেই নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ বাংলার সামাজিক জীবনের পরিচিত ছবি। তাই পুজোর আগে দোকানদারের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই ভাবিয়ে তুলছে অনেককে। একদিকে মিঠুনের ‘মুক্ত বাংলা’ মন্তব্য, অন্যদিকে শিলিগুড়ির পোস্টার ঘিরে বিতর্ক—সব মিলিয়ে আগরপাড়ার পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে উঠে এল রাজনীতি ও সমাজের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। শেষ পর্যন্ত উৎসবের আনন্দ কতটা অটুট থাকে, আর এই বিতর্ক মানুষের মনে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে সকলের।