ধর্মান্তরিত হলে আর মিলবে না সংরক্ষণের সুবিধা!মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের !

হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হলেই কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাবি করা যাবে অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণের সুবিধা? দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংবেদনশীল আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কে এবার চূড়ান্ত দাঁড়ি টেনে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণ বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ— কোনো ব্যক্তি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করলে, তাঁর ধর্মান্তর-পূর্ববর্তী জাতিগত বা সামাজিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতে তিনি আর অনগ্রসর মুসলিম বা ‘ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস মুসলিম’ (BCM) হিসেবে সংরক্ষণের সুবিধা দাবি করতে পারবেন না। তামিলনাড়ু সরকারের তরফে দায়ের করা বিশেষ আবেদন সরাসরি খারিজ করে এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখরের ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে— হিন্দু সমাজব্যবস্থা থেকে অন্য কোনো সমাজব্যবস্থায় ধর্মান্তরিত হলেই কোনো ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামিলনাড়ুর সরকার-বিজ্ঞপ্তিভুক্ত সাতটি অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে যান না। বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী আদালত পরিষ্কার বলেছে— সংবিধানের ১৬(৪) অনুচ্ছেদের অধীনে অনগ্রসর শ্রেণির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার সুযোগ কোনো ব্যক্তির পূর্বতন সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকতে পারে না। ধর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন ধর্মের কোনো নির্দিষ্ট অনগ্রসর গোষ্ঠীর অংশ হওয়া যায় না, এবং কোনো বেসরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও সংরক্ষণের এই মাপকাঠি নির্ধারণের অধিকার রাখে না।

এই ঐতিহাসিক মামলার শিকড় প্রোথিত ছিল তামিলনাড়ু সরকারের ২০২৪ সালের একটি নির্দেশিকায়। স্ট্যালিন প্রশাসনের ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল— অনগ্রসর শ্রেণি (BC), অতি অনগ্রসর শ্রেণি (MBC), ডিনোটিফায়েড কমিউনিটি (DNC) কিংবা তফসিলি জাতি (SC) তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁদের ‘ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস মুসলিম’ বা বিসিএম শংসাপত্র দেওয়া যাবে। কিন্তু মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন এবং বিচারপতি পি বি বালাজির বেঞ্চ সেই সরকারি নির্দেশ বাতিল করে দেয়। হাইকোর্ট স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল যে— তামিলনাড়ুতে স্বীকৃত সাতটি অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়, যেমন লাব্বাই, আনসার, ডেক্কানি বা শেখ— এগুলি মূলত জন্মগত সামাজিক পরিচিতি; নিছক ধর্মান্তরণের মাধ্যমে এই ধরনের জাতিগত মর্যাদা অর্জন করা যায় না। কারণ ইসলাম ধর্মে জাতিভেদের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই।

হাইকোর্টের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে তামিলনাড়ু ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস কমিশনের সুপারিশের দোহাই দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু শীর্ষ আদালত রাজ্য সরকারের যুক্তিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়। বেঞ্চ ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক ‘কনস্টিটিউশন (শিডিউলড কাস্টস) অর্ডার’-এর প্রসঙ্গ তুলে স্পষ্ট করে দেয় যে, সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী কেবল হিন্দু, বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মাবলম্বীরাই তফসিলি জাতি হিসেবে সংরক্ষণের আওতাভুক্ত হতে পারেন। এমনকি কেউ ইসলাম থেকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে এলেও যে তিনি আগের সংরক্ষিত মর্যাদা সরাসরি ফেরত পাবেন, তা-ও নয়।

উল্লেখ্য, সমীর আহমেদ নামে এক ব্যক্তি— যিনি ২০১৫ সালে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে নিজেকে ‘মুসলিম লাব্বাই’ দাবি করে সার্টিফিকেটের আবেদন করেছিলেন— তাঁর মামলার জেরেই এই আইনি লড়াই শুরু হয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সংরক্ষণ ব্যবস্থার মৌলিক ভারসাম্য রক্ষায় এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। শীর্ষ আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিল— ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে যে কেউ ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতা পেতেই পারেন, কিন্তু সেই ধর্মান্তরণকে অস্ত্র করে সংরক্ষণের সাংবিধানিক সুরক্ষা বা অনগ্রসর কোটার সুবিধা আদায়ের কোনো সুযোগ ভারতের সংবিধানে নেই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *