রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ নাকি ‘বঙ্গ’— বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিতর্ক ও টানাপোড়েনের এবার স্থায়ী অবসান ঘটাতে চলেছে রাজ্যের বর্তমান সরকার। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মত্যাগ আর দেশভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে অটুট রেখে রাজ্যের সাংবিধানিক নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’-ই বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন! শুধু বাংলায় নয়, এবার থেকে কেন্দ্রীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইংরেজিতে আর ‘West Bengal’ লিখতে হবে না; ইংরেজির বানানেও সরাসরি লেখা হবে ‘Paschim Banga’। বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনের শুরুতেই এই ঐতিহাসিক বিল পেশ হতে চলেছে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
বিগত তৃণমূল জমানায় রাজ্যের নাম বদলে ‘বাংলা’ বা ‘বঙ্গ’ করার একপ্রকার মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ২০২২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ করিয়ে কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নামের পেছনে রাজ্যের জন্মবৃত্তান্ত ও ঐতিহাসিক লড়াইকে মুছে ফেলার যে ছক ছিল, তা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন ইতিহাসবিদ ও সনাতনী সমাজ। শমীক ভট্টাচার্য সেই প্রসঙ্গ টেনে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন— “দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যবাসীকে আর কৃত্রিম ‘বাংলা’ বা ‘বঙ্গ’ শুনতে হবে না। এই রাজ্যের জন্মলগ্নের ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে কোনো অবস্থাতেই বিস্মৃত হতে দেওয়া যায় না। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অধিবেশনের প্রথমভাগেই বিল আনা হচ্ছে, যাতে এই রাজ্যের নাম তার শাশ্বত ইতিহাসের সঙ্গে চিরকাল সম্পৃক্ত থাকে।”
নাম বদলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বারাণসী তথা পবিত্র কাশীধামের সঙ্গে বাংলার সুপ্রাচীন নাড়ির টান ও আত্মিক মেলবন্ধনকে পুনরুজ্জীবিত করতে এক মহা-সাংস্কৃতিক প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন— বারাণসীর অগ্রগতির ইতিহাসে বাঙালিদের অবদান অবিস্মরণীয়। সেখানে মহিলাদের জন্য প্রথম যে ডিগ্রি কলেজ গড়ে উঠেছিল, তা এক বাঙালিরই হাতে তৈরি। কাশীর মাটিতে আজও বাঙালিদের স্কুল এবং সুবিখ্যাত ‘বাঙালি টোলা’ বাংলার সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
১৮৪৬ সালে কোচবিহারের মহারাজা বারাণসীর সেই বাঙালি টোলায় ঐতিহাসিক কালীবাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। যেখানে দুটি সুপ্রাচীন কালী মন্দির এবং ৬টি পবিত্র শিবলিঙ্গ রয়েছে। অথচ বিগত বাম ও তৃণমূল জমানার চরম উদাসীনতায় সেই পুণ্য ঐতিহ্য দীর্ঘদিন লালফিতের ফাঁসে বন্দি ছিল। বাম আমলে তৎকালীন জয়পুরের রাজমাতা মহারানী গায়ত্রী দেবী ৫ কোটি টাকা অনুদান দিতে চাইলেও প্রশাসনিক জটিলতায় সেই কাজ থমকে যায়। এমনকি ২০২২ সালেও তৃণমূল সরকার এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে কোনো সদিচ্ছা দেখায়নি।
সেই ঐতিহাসিক বঞ্চনা দূর করে শমীক ভট্টাচার্য জানান— কাশীর মাটিতে অবস্থিত সেই প্রাচীন কালীবাড়ি ও মন্দির কমপ্লেক্সটি এবার পূর্ণ মর্যাদায় পুনরুদ্ধার করা হবে। কোচবিহার রাজপরিবারকে সরাসরি সঙ্গে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হবে এক সুবিশাল ও আধুনিক ‘কালচারাল সেন্টার’ বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এর মাধ্যমে কাশী ও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক মেলবন্ধন বিশ্বমঞ্চে নতুন মাত্রা পাবে।
একদিকে বিধানসভায় বিল এনে রাজ্যের নাম স্বমহিমায় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রূপে প্রতিষ্ঠা করা, আর অন্যদিকে বারাণসীতে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে তোলার এই জোড়া পদক্ষেপ স্পষ্ট বার্তা দিল— তোষণ ও ইতিহাস বিকৃতির দিন পেরিয়ে বর্তমান বাংলা আজ নিজের শেকড় ও আত্মমর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করতেই বদ্ধপরিকর!
