প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার যে কতটা নড়বড়ে এবং প্রতিনিয়ত মৌলবাদী আগ্রাসনের মুখে কতটা বিপন্ন, ফের তার এক অত্যন্ত মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর উদাহরণ সামনে এলো। ওপার বাংলার গাইবান্ধা জেলায় সনাতন সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় কীর্তি স্থাপনের স্বপ্ন দেখাটাই যেন আজ এক হিন্দু ধর্মপ্রাণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল। বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে সম্পূর্ণ এক সাজানো ও তথাকথিত মিথ্যা মামলায় রবিবার গভীর রাতে গ্রেপ্তার করেছে সে দেশের পুলিশ।
পদ্মাপাড়ের অসহায় হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের স্পষ্ট দাবি, কোনো আর্থিক অপরাধ নয়, বরং মন্দির প্রাঙ্গণে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ৮১ ফুট উঁচু একটি জাঁকজমকপূর্ণ শ্রীরামচন্দ্রের মূর্তি নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই চরম আক্রোশের শিকার হতে হয়েছে এই হিন্দু ধর্মীয় নেতাকে। মৌলবাদী শক্তির গভীর ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনের একাংশের মদতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় ফাঁসানো হয়েছে হরিদাস বাবুকে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে বিশ্বের এই বৃহত্তম রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই ওপার বাংলার কট্টরপন্থী ও ইসলামপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি নানাভাবে মন্দিরে হামলা, হুমকি এবং তীব্র বাধা সৃষ্টি করে আসছিল। এমনকি তারা মন্দিরের অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ও অনুদান নিয়ে ভুয়ো তদন্তের দাবি তুলে এক চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে, যার জেরে একপর্যায়ে তীব্র সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তার অভাবে মন্দির কমিটি মূর্তি নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। ।
কিন্তু মৌলবাদীদের আক্রোশ সেখানেই থেমে থাকেনি; এবার হরিদাসের কণ্ঠরোধ করতে এবং সনাতনী আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ৯ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকারও বেশি অর্থ তছরুপের এক কাল্পনিক ও সাজানো অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। রবিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ পলাশবাড়ি থানার পুলিশ অত্যন্ত অন্যায়ভাবে মন্দির প্রাঙ্গণে হানা দিয়ে হরিদাস চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়। বাংলাদেশের বিতর্কিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে এই মামলাটি সাজানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সিআইডির তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, হরিদাসের পাঁচটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং চারটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে নাকি বিপুল পরিমাণ টাকা জমা ও তোলার অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে এবং তাঁরা দাবি করছেন যে হাওয়ালার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার করে এই সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা এবং ওপার বাংলার হিন্দু সমাজ এই সমস্ত বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগকে একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের স্পষ্ট বক্তব্য, বাংলাদেশে যখনই কোনো হিন্দু সমাজ নিজেদের ধর্মীয় গরিমা বা শ্রীরামচন্দ্রের মতো পরম আরাধ্য দেবতাকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখনই আইনি হেনস্থা এবং মিথ্যা মামলার চেনা অস্ত্র দিয়ে তাঁদের স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। তো তোষণ ও মৌলবাদের এই অন্ধকার অধ্যায়ে, ওপার বাংলায় সনাতনীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শ্রী হরিদাস চন্দ্রের এই নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিশ্বজুড়ে সরব হওয়া আজ প্রত্যেকটি ন্যায়পরায়ণ মানুষের পরম কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।