রাজনীতির ময়দান বড় নিষ্ঠুর। একসময় যাঁর দাপটে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত, আজ তাঁর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়—ক্ষমতা হারানোর যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তিনি তৃণমূলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের আগে যাঁর হেলিকপ্টার সফর আর বিলাসবহুল কনভয় ছিল দেখার মতো, আজ সেই অভিষেকের চেহারাতেই ধরা পড়ছে চরম বিধ্বস্ততার ছাপ। ক্লিনশেভ লুকে থাকা ফিটফাট নেতা আজ একমুখ খোঁচা দাড়ি আর বসে যাওয়া চোখে ধরা দিচ্ছেন ক্যামেরায়। মাত্র কয়েক দিনে কী এমন ঘটল যে পাল্টে গেল অভিষেকের জীবন?
এতদিন হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের ‘শান্তিনিকেতন’ ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। মাছি গলার উপায় ছিল না যেখানে, সেখানে আজ খাঁ খাঁ করছে রাস্তা। তৃণমূলের পরাজয়ের তিন দিনের মধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতিরিক্ত নিরাপত্তা সরিয়ে নিয়েছে লালবাজার। ডিজিপি সিদ্ধনাথ গুপ্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিয়ম মেনে কেবল Z+ ক্যাটাগরির বাহিনী থাকবে, বাকি অতিরিক্ত ভিআইপি খাতির আর নয়। বুধবার সকাল থেকেই ক্যামাক স্ট্রিট অফিস এবং শান্তিনিকেতন আবাসনের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে পুলিশের সেই বিশাল বাহিনী। যে পুলিশ এতদিন সাধারণ মানুষকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিত, তারা আজ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা সামলাতে ব্যস্ত। দাপট কমতেই কি তবে মানসিক চাপে এই চেহারার পরিবর্তন? শুধু বাইরে নয়, ঘরের অন্দরেও পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর দলের নিচুতলা থেকে ওপরতলা—সবাই যেন হঠাৎ বিদ্রোহী।
তৃণমূলের দলীয় বৈঠকে যখন একের পর এক নেতা অভিষেককে নিশানায় নিচ্ছেন, তখন পিসি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ড্যামেজ কন্ট্রোল কি আদৌ সম্ভব? প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময় দাপট দেখানো সেই নেতার মুখে আজ আর কথা নেই। গণনাকেন্দ্র থেকে নির্বাচন কমিশনের বের করে দেওয়া থেকে শুরু করে অখিলেশ যাদবের সঙ্গে দেখা করার সেই ছবি—সবখানেই অভিষেক আজ ছায়া মাত্র। অখিলেশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছবিতে স্পষ্ট—বিভ্রান্ত এবং বিপর্যস্ত এক যুবনেতা, যার দাপট আজ ইতিহাস।
আসলে বিজেপি এবং শুভেন্দু অধিকারীর লড়াকু মানসিকতার সামনে আজ তৃণমূলের তাসের ঘর ভেঙে পড়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে অহংকার নিয়ে বাংলাজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মানুষের ভোট আজ সেই অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তোষণের রাজনীতি আর কাটমানির যে অভিযোগ বাংলার মানুষ তুলেছিল, তারই জবাব আজ এই ফল। ক্ষমতা নেই, তাই নিরাপত্তাও নেই! কিন্তু নিরাপত্তা নেই বলেই কি আজ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন তৃণমূলের যুবরাজ? ক্লিনশেভ লুক হারিয়ে একমুখ দাড়ি নিয়ে অভিষেকের এই বিধ্বস্ত চেহারা আসলে তৃণমূলের সামগ্রিক পতনেরই প্রতিফলন। হ্যাঁ, সময়ের চাকা ঘোরে! যারা ভাবত তারা অমর, তাদেরও আজ সাধারণের কাতারে নেমে আসতে হচ্ছে। অভিষেকের এই পরিবর্তন কি শুধুই শারীরিক, নাকি রাজনৈতিকভাবেও তার দিন ফুরিয়ে এল? আপনার কী মনে হয়? জানান কমেন্টে!
