ভোটের রাজনীতির স্বার্থে সরাসরি নগদ অর্থ বিলির তোষণ নীতিতে এবার পুরোপুরি দাঁড়ি টানল রাজ্য প্রশাসন! একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট কেনার জন্য দেওয়া এককালীন ১০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান প্রকল্প পাকাপাকিভাবে বন্ধ করার এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন— পূর্বতন সরকারের আমলে চালু হওয়া ‘তরুণের স্বপ্ন’ নামের এই প্রকল্প নতুন সরকারের জমানায় আর এক মুহূর্তের জন্যও কার্যকর রাখা হবে না। তবে সরাসরি টাকা দেওয়ার এই জনপ্রিয় প্রথা বন্ধ করলেও শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে পরিকাঠামো গড়তে রাজ্য সরকার যে আরও অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে প্রস্তুত, সেই আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন— সরকার শিক্ষার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তির বিকাশ কিংবা স্কুলের আধুনিকীকরণে কোনো কার্পণ্য করবে না। তবে পড়ুয়াদের ব্যক্তিগতভাবে মোবাইল ফোন কেনার জন্য সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে টাকা দেওয়ার অপসংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া যায় না। শুভেন্দু অধিকারীর সোজাসাপ্টা বার্তা— “আমরা প্রয়োজনে আরও বেশি টাকা খরচ করে প্রতিটি স্কুলে উন্নত কম্পিউটার ল্যাব, আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম এবং বিশ্বমানের শিক্ষা উপকরণ গড়ে তুলব, যাতে সমস্ত শিক্ষার্থী সমানভাবে প্রযুক্তির আসল সুবিধা পায়। কিন্তু পড়ুয়াদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার জন্য আর কোনো টাকা দেওয়া হবে না!”
২০২২ সালে তৎকালীন সরকারের চালু করা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়ার অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১০ হাজার টাকা পাঠানো হতো। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন পর্যালোচনা করে দেখেছে যে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই টাকা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার ফল দাঁড়িয়েছে মারাত্মক বিপরীত। অনলাইন শিক্ষার নামে কিশোর-কিশোরীদের হাতে তুলে দেওয়া এই যন্ত্রটি পড়াশোনার চেয়ে বেশি আসক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। গভীর রাত পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল দেখা, অনলাইন গেমসের অন্ধ মোহ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য, গভীর ঘুম ও স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে কার্যত পঙ্গু করে তুলছে।
শিক্ষার্থীদের এই মারাত্মক আসক্তি থেকে মুক্ত করতে গুজরাট মডেলের উদাহরণ তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। গুজরাটের মতো স্কুলেও প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে তিনি জানান— নগদ টাকার অনুদান বন্ধ করা কিংবা কড়া নিয়ম চালু করা হয়তো রাজনৈতিক দিক থেকে কঠিন সিদ্ধান্ত এবং এতে ভোটব্যাংকে কিছুটা ধাক্কাও লাগতে পারে, কিন্তু ভোটের লাভ-ক্ষতি দেখে কোনো দায়িত্বশীল সরকার চলতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, চরিত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যকে রক্ষা করতে এমন কঠোর ও বৈপ্লবিক সংস্কার আজ অত্যন্ত জরুরি। সরকারি নগদ বিলির বদলে ক্লাসরুমে যৌথভাবে আধুনিক প্রযুক্তির পাঠ দেওয়ার এই সাহসী পদক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থাকে এক নতুন ও সুশৃঙ্খল দিশা দেখাবে বলেই মনে করছে সচেতন শিক্ষামহল।