বুধবার বিধানসভার অলিন্দে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। ভবানীপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে শপথ নিলেন বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এই শপথের সাথেই এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হলো নন্দীগ্রামে। যে মাটি শুভেন্দুকে ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমা দিয়েছিল, যে মাটি দু-দুবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দম্ভ চূর্ণ করেছে—সেই নন্দীগ্রাম আসনটি নিয়ম মেনে ছেড়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আর তার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, মেদিনীপুরের এই গড় রক্ষা করতে কাকে পাঠাবেন শুভেন্দু?
তৃণমূল জমানার শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়েছিল এই নন্দীগ্রামেই। ২০২১-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে শুভেন্দু যে জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন, ২০২৬-এ ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—উভয় কেন্দ্রেই মমতাকে পর্যুদস্ত করে তা পূর্ণতা পেয়েছে। কিন্তু এক অঙ্গে দুই রূপ যেমন সম্ভব নয়, তেমনই একই সাথে দুই কেন্দ্রের বিধায়ক থাকা যায় না। তাই ঘরের মাঠ নন্দীগ্রামে এবার হতে চলেছে হাই-ভোল্টেজ উপ-নির্বাচন। প্রার্থী তালিকায় প্রথম যে নামটি সবথেকে জোরে শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী এবং লড়াকু নেতা মেঘনাদ পাল। যিনি ২০২১-এ শুভেন্দুর নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে এই দুর্ভেদ্য দুর্গ আগলে রেখেছিলেন। নন্দীগ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা যাঁর চেনা, সেই ভূমিপুত্র মেঘনাদ পালকেই কি দল বেছে নেবে? স্থানীয় স্তরে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে এই দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। তবে চমকের শেষ এখানেই নয়! বিজেপির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এক ‘গ্লোবাল বেঙ্গলি’ বা বিশ্বখ্যাত বাঙালির নাম। তিনি আর কেউ নন—বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যাল। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে তাঁর স্ত্রী স্মিতার সাথে সাবেকি সাজে তাঁর উপস্থিতি এক বিরাট সংকেত দিচ্ছে। অক্সফোর্ড থেকে সেন্ট জেভিয়ার্স—যাঁর পাণ্ডিত্যের কথা সারা বিশ্ব জানে, তাঁকে কি নন্দীগ্রামের প্রার্থী করে রাজ্যের আগামী অর্থমন্ত্রী হিসেবে ভাবছেন শুভেন্দু?
সঞ্জীব সান্যালের নাম আসা মানেই এক বৌদ্ধিক বিপ্লব। নেহেরু-যুগের সেই স্থবিরতা ভেঙে যারা নতুন ভারতের স্বপ্নে বিশ্বাসী, তাদের কাছে সঞ্জীব এক আদর্শ মুখ। অন্যদিকে, তৃণমূলের তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’ মহলে এখনই কম্পন শুরু হয়েছে। কারণ, সঞ্জীব সান্যালের মতো ব্যক্তিত্ব যদি বিধানসভায় আসেন, তবে বিরোধীদের যুক্তির লড়াইয়ে টেকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিজেপির এই রণকৌশল অত্যন্ত পরিষ্কার। একদিকে মেঘনাদ পালের মতো মাটির মানুষ, অন্যদিকে সঞ্জীব সান্যালের মতো বিশ্বমানের মেধা—উভয় পথই তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার জন্য যথেষ্ট। শুভেন্দু অধিকারী জানেন, নন্দীগ্রাম কেবল একটি আসন নয়, এটি তাঁর সম্মানের লড়াই। তাই প্রার্থী যে-ই হোন না কেন, গেরুয়া ঝড় যে আবার নন্দীগ্রামের বুক চিরে বইবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।