মেট্রো রেলের কানেক্টিভিটি, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, নতুন বিমানবন্দর নাকি নদী ভাঙন রোধে মেগা প্রকল্প? পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে বদলে যেতে চলেছে আপনার নিজের জেলার অর্থনৈতিক মানচিত্র। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভায় যেমন প্রতিটা জেলাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনই অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের প্রথম বাজেটে বাংলার ২৩টি জেলার জন্যই রইল বড় বড় চমক। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—কার ভাগ্যে কী জুটল? আপনার জেলা নতুন কী পেতে চলেছে? সমস্ত জেলার সম্পূর্ণ ও এক্সক্লুসিভ তালিকাটি জানতে ভিডিওটি একদম শেষ পর্যন্ত দেখুন!
শুরু করা যাক উপকূলবর্তী এবং দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলি দিয়ে। নদী বাঁধের সুরক্ষা থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র বন্দর—কী নেই এই তালিকায়!
১. উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা:
উত্তর ২৪ পরগনা: সুন্দরবন এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী বাঁধের পুনর্নিমাণ করা হবে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সাগরদ্বীপে যাতায়াত সহজ করতে তৈরি হচ্ছে বহুপ্রতিক্ষিত ‘মুড়িগঙ্গা সেতু’। যার জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রথম দফায় ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের দ্বীপপুঞ্জের যোগাযোগে আরও ১০০ কোটি বরাদ্দ হয়েছে। ফলতাকে সাজানো হবে মডেল ব্লক হিসেবে। কুলপি বন্দরের আধুনিকীকরণসহ সাগর ও ফলতায় তৈরি হবে নতুন মহিলা কলেজ।
২. পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম:
পূর্ব মেদিনীপুর: দাদনপাত্রবাড়ে পিপিপি (PPP) মডেলে তৈরি হবে একটি অত্যাধুনিক গভীর সমুদ্র বন্দর। নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অল-ওয়েদার সেতু এবং কাঁথিতে নতুন মহিলা কলেজ ও পুলিশ জেলা গঠিত হবে।
পশ্চিম মেদিনীপুর: ঘাটালের চিরস্থায়ী বন্যা সমস্যা মেটাতে ১২০০ কোটি টাকার মেগা মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছে। কোলাঘাটে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হবে ফুল-চাষিদের জন্য ‘ইন্টিগ্রেটেড ফ্লাওয়ার মার্কেট হাব’।
ঝাড়গ্রাম: আদিবাসীদের শিক্ষার উন্নয়নে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হবে বিশেষ ‘আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয়’। এর পাশাপাশি ১৬০ একর জমিতে গড়ে উঠবে রোমাঞ্চকর টাইগার সাফারি।
এবার চোখ রাখা যাক শিল্পাঞ্চল, রাঢ়বঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গের জেলাগুলির দিকে, যেখানে যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
৩. হাওড়া, হুগলি ও নদীয়া:
হাওড়া: ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে চাঙ্গা করতে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ‘পাটশিল্প ক্লাস্টার’।
হুগলি: ডানকুনিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ‘মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং ডানকুনি-সুরাট ফ্রেট করিডর দ্রুত বাস্তবায়িত করা হবে। ডানকুনি থেকে মগরার মধ্যে ফ্লাইওভার ও সার্ভিস রোডসহ একটি হাই-টেক করিডর তৈরি হবে।
নদীয়া: কল্যাণীর ১০০০ থেকে ১৫০০ একর জমিতে তৈরি হতে চলেছে রাজ্যের নতুন ‘গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর’। এর পাশাপাশি মায়াপুরকে বিশ্বমানের পর্যটনক্ষেত্র হিসেবে সাজাতে ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
৪. পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া:
পূর্ব বর্ধমান: কালনা ও শান্তিপুরের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হবে বিশাল সেতু।
পশ্চিম বর্ধমান: আসানসোল ও দুর্গাপুরের মধ্যে মেট্রো সংযোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তৈরি হবে নতুন মেডিকেল কলেজ এবং দুর্গাপুর, আসানসোল ও পানাগড়ে স্থাপন হবে হাই-টেক সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট।
বীরভূম: ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর মোট দুটি নতুন সেতু তৈরিতে ৮০০ কোটি এবং বক্রেশ্বরে ২০০০ কোটি টাকা খরচে তৈরি হবে মেগা ফ্লোটিং সোলার প্রজেক্ট।
পুরুলিয়া: অযোধ্যা পাহাড়, মুরগুমা ও বরন্তীকে যুক্ত করে তৈরি হচ্ছে ‘ইন্টিগ্রেটেড টুরিজম সার্কিট’। উড়ান স্কিমে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় তৈরি হবে নতুন বিমানবন্দর ও নবোদয় স্কুল।
সবশেষে দেখে নেওয়া যাক উত্তরবঙ্গ এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলির বরাদ্দ।
৫. মালদহ ও মুর্শিদাবাদ:
মালদহ: আমচাষিদের বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও প্যাক হাউস তৈরি হবে। কালিয়াচকে তৈরি হবে মহিলা কলেজ।
মুর্শিদাবাদ: জঙ্গিপুরে নদী ভাঙন ও বন্যা রুখতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জঙ্গিপুরে তৈরি হবে মহিলা কলেজ এবং বিড়ি শ্রমিকদের হাসপাতালের আধুনিকীকরণ করা হবে। এছাড়া মালদহ ও জঙ্গিপুর—উভয় জায়গাই পাবে নতুন বিমানবন্দর।
৬. উত্তরবঙ্গের ৫ জেলা ও পাহাড়:
জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার :
শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির মধ্যে মেট্রো চলাচলের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। আলিপুরদুয়ারে তৈরি হবে নতুন মেডিকেল কলেজ এবং চালু হবে প্রধানমন্ত্রী ধনধান্য কৃষি যোজনা।
কোচবিহার: কোচবিহার এয়ারপোর্টের রানওয়ে সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করা হবে। তুফানগঞ্জে তৈরি হবে নতুন মহিলা কলেজ।
দার্জিলিং ও কালিম্পং: শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। চা বাগানের সুবিধার্থে তৈরি হবে ‘টি প্রসেসিং সেন্টার’। কালিম্পং পাবে নতুন মেডিকেল কলেজ। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঝরনাগুলি পুনরুজ্জীবিত করতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সর্বোপরি, উত্তরবঙ্গবাসী পেতে চলেছেন একটি স্বপ্নের এইমস (AIIMS) হাসপাতাল এবং একটি বিশ্বমানের ক্যানসার হাসপাতাল।
প্রতিটি জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রয়োজনকে মাথায় রেখে শুভেন্দু সরকারের এই অল-রাউন্ডার বাজেট সত্যিই এক নতুন উন্নত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার ডাক দিচ্ছে। আপনার জেলার জন্য হওয়া এই সমস্ত বড় ঘোষণার মধ্যে কোন প্রকল্পটি আপনার সবচেয়ে সেরা মনে হলো? আপনার জেলা এই বাজেটে যা পেল, তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত অবশ্যই জানান।