পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার গ্রহণ করে রাজ্যকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, এবার দলীয় সংগঠনকে আরও মজবুত ও নিঁখুত করতে সরাসরি ময়দানে নেমে পড়লেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনিক প্রধানের গুরুদায়িত্ব সামলানোর সাথে সাথেই তিনি যে সমান দক্ষতায় সাংগঠনিক স্তরেও নিজের আধিপত্য বজায় রাখছেন, রবিবার মেচেদায় আয়োজিত এক মেগা সাংগঠনিক বৈঠক তারই এক অনন্য ও বলিষ্ঠ নজির স্থাপন করল। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সমস্ত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও মণ্ডল কমিটির নেতৃত্বদের নিয়ে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আর এই লড়াকু মঞ্চ থেকেই নিজের ছেড়ে দেওয়া বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামের আসন্ন উপনির্বাচন নিয়ে এক বিরাট রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কঙ্কালসার সাংগঠনিক অবস্থাকে তুলোধোনা করে তীব্র খোঁচা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, আগামী দুই মাসের মধ্যেই নন্দীগ্রামের পবিত্র মাটিতে উপনির্বাচন সম্পন্ন হতে চলেছে এবং এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় শুধু সময়ের অপেক্ষা।
মেচেদার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও কড়া সুরে বলেন যে, নন্দীগ্রামের লড়াই নিয়ে তিনি এখনই অতিরিক্ত কিছু বলতে চান না, তবে স্থানীয় স্তরে ভোট হলেই বোঝা যাবে বাংলার রাজনৈতিক আবহাওয়া কতটা বদলে গিয়েছে। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ভোট ঘোষণা হলে কী কালীঘাটের পুরনো তৃণমূল, আর কী তথাকথিত নতুন তৃণমূল— কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই এই নন্দীগ্রামে ভোটে দাঁড় করানোর মতো কোনো যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিরোধীরা আগে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করুক, তারপর তাদের সাথে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামবে ভারতীয় জনতা পার্টি।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, স্থানীয় স্তরের নির্বাচনে বর্তমানে কালীঘাট ও ঋতুব্রত তৃণমূলের অবস্থা সম্পূর্ণ এক এবং সমানভাবে বেহাল। আসলে বিগত দিনে দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভর করে এ রাজ্যে তৃণমূলের অস্তিত্ব টিকে ছিল— যার প্রথমটি হলো পুলিশের একাংশের দলদাসের মতো ভূমিকা এবং দ্বিতীয়টি হলো কোটি কোটি টাকা দিয়ে ভাড়া করা ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাক। কিন্তু রাজ্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর আজ সেই আজ্ঞাবহ পুলিশও নেই, আর আইপ্যাক তো নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগেই নিজেদের পাততাড়ি গুটিয়ে রাজ্য থেকে চম্পট দিয়েছে। ফলে আজ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ আর মোড়ে মোড়ে হাত পাতার নোংরা সংস্কৃতি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে এবং এই মহতী পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষ খুব শীঘ্রই আরও গভীরভাবে টের পাবেন।
রবিবার মেচেদার এই দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা মেগা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন তমলুকের জনপ্রিয় সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, রাজ্যের হেভিওয়েট মন্ত্রী হরেকৃষ্ণ বেরা, অশোক দিন্দা, বিশিষ্ট বিধায়ক দিব্যেন্দু অধিকারী, সিন্টু সেনাপতি, নির্মল খাঁড়া, সুভাষচন্দ্র পাঁজা এবং প্রদীপ বিজলীর মতো জেলার একঝাঁক শীর্ষ জনপ্রতিনিধি। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরের পাশাপাশি নিজের আদি কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকেও প্রায় সাড়ে নয় হাজার ভোটের ব্যবধানে এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিয়মমাফিক সেই আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে যে উপনির্বাচন হচ্ছে, তাতে বিজেপি রেকর্ড মার্জিনে জয়লাভ করবে বলে রাজনৈতিক মহল নিশ্চিত।
এদিনের বৈঠকে একেবারে অকাট্য তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জোরের সাথে দাবি করেন যে, বর্তমানে যেখানে রাজ্যে গড়ে ৫৬ শতাংশ ভোট পড়ছে, সেখানে আগামী দিনে পূর্ব মেদিনীপুরের পবিত্র মাটিতে যে কোনো নির্বাচনে তা একলাফে ৭০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং বিরোধী শিবির প্রার্থী দেওয়ার লোক পর্যন্ত খুঁজে পাবে না। তো সন্ত্রাস ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে, বুথ স্তর থেকে নতুন করে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বীজ বুনতে এবং শুভেন্দুর হাত ধরে পূর্ব মেদিনীপুরকে পুরোপুরি বিরোধীমুক্ত করতে নতুন সরকারের এই সাংগঠনিক রণকৌশল সত্যিই এক অপরাজেয় ও শক্তিশালী বাংলার অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।