সংসার চালানোর লড়াইটা কতখানি নির্মম হতে পারে, তা ভাটপাড়ার পূর্বাশা এলাকার ত্রিশ বছরের যুবক কৃষ্ণ চৌধুরী নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। প্রায় ছয় মাস আগে যখন ভাটপাড়া রিলায়েন্স জুটমিল থেকে তাঁর চাকরিটা চলে যায়, তখন থেকেই কৃষ্ণর চোখের সামনে নেমে এসেছিল এক ঘন অন্ধকার। কিন্তু হেরে যাওয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। বাড়িতে বৃদ্ধা মা, সঙ্গে আরও কয়েকজন নির্ভরশীল সদস্য। প্রতিদিনের ডাল-ভাতের সংস্থান করতে, মায়ের মুখের হাসিটা টিকিয়ে রাখতে কালঘাম ছুটে যেত তাঁর। কখনো মাথায় মাল বয়েছেন, কখনো সাধারণ দিনমজুরের কাজ করেছেন। যেখানেই দু-পয়সা আয়ের সুযোগ দেখেছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছেন এই পরিশ্রমী যুবক।
মাত্র দু-দিন আগে এক বুক আশা নিয়ে কলকাতার তারাতলায় একটি পাইপলাইন প্রকল্পে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে যোগ দিয়েছিলেন কৃষ্ণ। ভেবেছিলেন, হয়তো এবার কাটবে দিনবদলের পালা, একটু থিতু হতে পারবে পরিবারটা। কিন্তু নিয়তির পরিহাস যে এতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে, তা কে জানত। বুধবার দুপুরের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত সব ওলটপালট করে দিল। তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ কারখানার গোডাউনের বিশাল ছাদটা যখন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেলেন কৃষ্ণসহ আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ-আশার আলোটা বদলে গেল এক মর্মান্তিক হাহাকারে। এই দুর্ঘটনায় যে পাঁচজন শ্রমিকের প্রাণ গেছে, কৃষ্ণ তাঁদেরই একজন।
ভাটপাড়ার পূর্বাশা এলাকায় যখন এই খবর পৌঁছাল, তখন যেন গোটা পাড়াটাই স্তব্ধ হয়ে গেল। যে ছেলেটা একা হাতে পুরো সংসারের দায়িত্ব টানত, যে ছেলেটার পরিশ্রমে মা দু-মুঠো অন্ন পেতেন, সে আজ আর নেই।
কৃষ্ণর বৃদ্ধা মা আজ শোকে সম্পূর্ণ পাথর, চোখ দিয়ে জল শুকিয়ে গেছে তাঁর। ভাই সরবান চৌধুরী আর প্রতিবেশীরা আজ দিশেহারা। এখনো ভাইয়ের শেষ মুখটুকু দেখার সুযোগ পাননি সরবান, পুলিশের খাতায় নথিপত্র গোছাতেই কাটছে সময়। প্রতিবেশী অমিত সাউ আক্ষেপ করে বলছিলেন, কৃষ্ণ কতটা ভদ্র আর কর্মঠ ছিলেন। কাজের কোনো বাছবিচার ছিল না তাঁর, লক্ষ্য ছিল শুধু পরিবারের মুখে অন্ন জোগানো। আজ কৃষ্ণর চলে যাওয়ার সাথে সাথে একটি গোটা পরিবার এক লহমায় সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ল।
জুটমিলের কাজ হারানোর পর থেকে যে অনিশ্চয়তার শুরু হয়েছিল, তারাতলার এই ধ্বংসস্তূপ যেন চিরতরে সেই জীবনের স্পন্দনকে স্তব্ধ করে দিল। কর্মস্থলের এই মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, পিষে দিয়ে গেছে একটি দরিদ্র পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনকেও।