বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই সমস্ত উৎসবের মধ্যমণি শারদোৎসব। কিন্তু ভাবুন তো, একই বছরে যদি মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার দুর্গাপুজো উদযাপনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে বাঙালির বাঁধভাঙা আনন্দ আর উন্মাদনা কোন পর্যায়ে পৌঁছবে? শুনতে রূপকথা বা অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সম্প্রতি এমনই এক চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর জল্পনা ঘিরে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল— সর্বত্রই এখন একটাই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন: ২০২৮ সালে কি সত্যিই দু’বার পালিত হতে চলেছে দুর্গাপুজো? এই তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শাস্ত্রীয় দিনক্ষণ নির্ধারণে ব্যবহৃত দুই প্রধান পঞ্জিকা পদ্ধতির এক দুর্লভ ও জটিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের সংঘাত!
বাংলায় আবহমানকাল ধরে দুর্গাপুজোর নির্ঘণ্ট স্থির করার ক্ষেত্রে দুটি পৃথক গণনাপদ্ধতি প্রচলিত। একটি হলো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রহগতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘দৃকসিদ্ধ’ বা ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’, যা মূলত রামকৃষ্ণ মিশন ও বেলুড় মঠ কঠোরভাবে অনুসরণ করে। অন্যদিকে দ্বিতীয়টি হলো সনাতন ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’, যা মেনে প্রকাশিত হয় জনপ্রিয় ‘গুপ্তপ্রেস’ পঞ্জিকা এবং যার ওপর ভিত্তি করে বাংলার সিংহভাগ বারোয়ারি ও পারিবারিক দুর্গাপুজো পরিচালিত হয়। এই দুই পদ্ধতির তিথি গণনায় সামান্য কয়েক ঘণ্টা বা দিনের হেরফের হামেশাই ঘটে থাকে। কিন্তু জ্যোতিষীদের হিসাব বলছে— ২০২৮ সালে এই দুই পঞ্জিকার গণনায় সৃষ্টি হতে পারে এক নজিরবিহীন ব্যবধান, যার জেরে দুই পদ্ধতির পুজোয় প্রায় ১৫ দিন থেকে এক পক্ষের বিরাট ফারাক তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তবে পঞ্জিকার এমন বৈপরীত্য বা বিভ্রান্তি বাঙালির ইতিহাসে একেবারে নতুন নয়। প্রায় সাড়ে চার দশক আগে, ১৯৮০ সালেও তৈরি হয়েছিল ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক ও অদ্ভুত পরিস্থিতি। সে বছর দুই পঞ্জিকার গণনায় এতটাই আকাশ-পাতাল ফারাক ছিল যে, এক পঞ্জিকা মতে যখন মহালয়ার তর্পণ চলছিল, অন্য পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী তখন মানুষ মেতে উঠেছিল শ্যামাপুজো বা কালীপুজোর আনন্দে! এমনকি এক মতে যখন মহানবমীর পুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, অন্য মতে তখন উদযাপিত হচ্ছিল জগদ্ধাত্রী পুজো। সেই ১৯৮০ সালের নজিরবিহীন ঘটনার স্মৃতি টেনেই এবার ২০২৮ সালের ক্যালেন্ডার নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে সীমাহীন কৌতূহল।
কিন্তু এই জল্পনার সত্যতা কতটা? কী বলছেন খোদ পঞ্জিকা বিশেষজ্ঞরা? ঐতিহ্যবাহী গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার কর্ণধার অরিজিৎ রায়চৌধুরী জানিয়েছেন— তাঁদের পঞ্জিকা মূলত প্রাচীন সূর্যসিদ্ধান্তের নির্ভুল শাস্ত্রীয় গণনা মেনেই প্রস্তুত হয়। তবে ২০২৮ সালের মতো দীর্ঘমেয়াদী নির্ঘণ্ট নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সমীচীন নয়। কারণ বর্তমানে ২০২৭ সালের পঞ্জিকা গণনার কাজ চলছে, এবং সেই বছরের অষ্টমী ও নবমী তিথি নির্ধারণেও কিছু বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিস্থিতি রয়েছে।
অন্যদিকে বর্ষীয়ান পঞ্জিকাবিদ পূর্ণচন্দ্র শীল অতীতে ফিরে গিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে— এমন ঘটনা নিশ্চিতভাবেই ঘটেছে, যেখানে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল কার্তিক মাসে এবং সূর্যসিদ্ধান্তের গণনায় তা পালিত হয়েছিল আশ্বিন মাসে। ফলে ২০২৮ সালেও যদি তিথির জটিল চক্রের কারণে দুই পঞ্জিকায় উল্লেখযোগ্য দিনকালের ফারাক ঘটে, তবে তা যে শাস্ত্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিরাট আলোড়ন ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন— দুই পদ্ধতির নিজস্ব নিখুঁত গাণিতিক ভিত্তি রয়েছে, তাই কোনো একটিকে ভুল বা অন্যটিকে ঠিক বলে দেগে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
তা হলে কি ২০২৮ সালে বাংলায় সত্যিই দু’বার ঢাকের বাদ্যি বাজবে? তার চূড়ান্ত উত্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট বছরগুলির আনুষ্ঠানিক পঞ্জিকা ও নির্ঘণ্ট প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। তবে পঞ্জিকার তিথি যা-ই হোক, মা দুর্গার আরাধনা যে বাঙালির কাছে কেবল দিনক্ষণের অঙ্ক নয়, বরং অপার বিশ্বাস আর অন্তরের টান— তাই দুই মতে দুই সময়ে পুজো হলেও মায়ের প্রতি বাঙালির ভক্তি ও উৎসবের আবেগে যে এতটুকুও ভাঁটা পড়বে না, তা নিশ্চিত!