তৃণমূলের চিহ্ন নেই, মাথাচাড়া দিচ্ছে কঙ্কাল কাণ্ডের নায়করা !গড়বেতার মঞ্চ থেকে বাম আমলের ফাইল রি-ওপেনের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর !

দু’দিন আগেই যাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও তৃণমূল কর্মীদের ফাঁসানোর মারাত্মক অভিযোগ তুলে সরাসরি মঞ্চ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিম মেদিনীপুরের সেই বিতর্কিত জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানাকেই এক ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর টাস্ক সঁপে দিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার হাইভোল্টেজ জনসভা থেকে ভরা ময়দানে দাঁড়িয়ে জেলা পুলিশ সুপারকে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি নির্দেশ দিলেন— বাম জমানার ছোট আঙারিয়া কাণ্ড থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয়ের অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র, সিপিআইএম নেতা তপন ঘোষকে অবিলম্বে খুঁজে বের করে শ্রীঘরে ঢোকাতে হবে! একই সাথে বাম আমলের যাবতীয় হিংসা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ধামাচাপা পড়ে থাকা ফাইল নতুন করে রি-ওপেন করার স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

গড়বেতার এই জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য যেন এক লহমায় ফিরিয়ে এনেছিল দুই দশক আগের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সেই কালো দিনগুলোর স্মৃতি। সিপিআইএম ও তৃণমূলকে এক বন্ধনীতে রেখে আক্রমণ শানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— “ছোট আঙারিয়া থেকে শুরু করে ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়— গড়বেতার যে সিপিআইএম পার্টি অফিস থেকে অস্ত্রশস্ত্র আর ভাড়াটে বন্দুকবাজ পাঠিয়ে নিরীহ মানুষের রক্তে লাল করা হয়েছিল নন্দীগ্রামের মাটি, সেই সমস্ত ঘটনার কেস ফাইল আমি নতুন করে রি-ওপেন করব। একটা অপরাধীকেও রেয়াত করা হবে না।” অতীত সংঘাতের স্মৃতি উসকে দিয়ে শুভেন্দু মনে করিয়ে দেন— “তপন-সুকুর একসময় শাসিয়েছিল শুভেন্দু অধিকারী এলাকায় ঢুকলে পা ভেঙে দেবে। আর আমি মাত্র তিন দিনের মাথায় চন্দ্রকোনা রোডে ঢুকে তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা সুশান্ত ঘোষের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে জনসভা করে জবাব দিয়েছিলাম।”

এরপরই সভার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে জেলা পুলিশ সুপারের ভূমিকা। মঞ্চে উপস্থিত পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— “বাংলা থেকে তৃণমূলের নাম-নিশানা মুছে গিয়েছে। আর সেই ফাঁকে ফের মাথাচাড়া দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে কঙ্কাল কাণ্ডের সেই পুরোনো নায়করা। তপন কোথায় এখন? এলাকায় আছে, নাকি ভয়ে পালিয়েছে? এসপি ম্যাডাম, ওকে যেখান থেকেই হোক খুঁজে আনতে হবে আপনাকে। আমি ওকে জেলের ভেতরে দেখতে চাই।”

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের সেই নারকীয় ছোট আঙারিয়া গণহত্যা এবং ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্যতম মূল অভিযুক্ত হিসেবে নাম উঠে এসেছিল গড়বেতা ও চন্দ্রকোনার দুই কুখ্যাত চরিত্র তপন ঘোষ এবং সুকুর আলির। যদিও ২০০৯ সালে প্রমাণের অভাবে ছোট আঙারিয়া মামলায় তাঁরা বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন এবং সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনেও গড়বেতা কেন্দ্র থেকে সিপিআইএমের প্রার্থী হয়েছিলেন তপন ঘোষ।

তবে গোটা ঘটনার প্রেক্ষাপট আরও বেশি নাটকীয় হয়ে উঠেছে কারণ, মাত্র দু’দিন আগেই ঘাটালের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুরের এই পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানার নাম করে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। অভিষেক অভিযোগ করেছিলেন— নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে এসপি নাকি তাঁকে মেসেজ করে তৃণমূলের জয়ের বার্তা দিয়েছিলেন, আর বিজেপি সরকার গঠিত হতেই পল্টি মেরে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে খুশি করতে হাজার হাজার তৃণমূল কর্মীকে মিথ্যা মামলায় জড়াচ্ছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের পর যথারীতি পালটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে সিপিআইএম নেতৃত্ব। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন— “তপন-সুকুরকে গ্রেফতার করবেন? পারলে করুন, দম থাকলে করে দেখান। আমরাও রাজনৈতিক ও আইনিভাবে দেখে নেব!”

একদিকে অভিষেকের প্রকাশ্য হুমকি, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাম আমলের কেলেঙ্কারি খোলার সরাসরি টাস্ক— দুই রাজনৈতিক শক্তির সাঁড়াশি চাপের মুখে দাঁড়িয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা এবার কী পদক্ষেপ নেন, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য রাজনীতি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *