বারুইপুরের পর গাইঘাটায় ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তের এনকাউন্টার, আর তার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে এক বিজেপি কর্মী খুনে অভিযুক্ত যুবকের এনকাউন্টারে মৃত্যু! একই দিনে বাংলায় জোড়া এনকাউন্টারের এমন নজিরবিহীন ঘটনায় যখন রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরেই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিমানবন্দরে পা রেখেই কোনো রকম রাখঢাক না করে তিনি জানিয়ে দিলেন— রাজ্যের পুলিশ বাহিনীকে দুটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সম্পূর্ণ এবং অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া রয়েছে; আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ অফিসাররা কোনো আইনি জটিলতা বা প্রতিকূলতার মুখে পড়লে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশমন্ত্রী হিসেবে তাঁদের সামনে দুর্ভেদ্য ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন তিনি!
মঙ্গলবার সকাল থেকেই শিরোনামে ছিল উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার ঘটনা, যেখানে ক্রাইম সিন পুনর্নির্মাণ করে ফেরার পথে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালানোর পর পালটা এনকাউন্টারে নিহত হয় নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মূল অভিযুক্ত। সেই ঘটনার আলোড়ন থামতে না থামতেই দুপুরে ধুলিয়ানে প্রকাশ্যে এক বিজেপি কর্মীকে কুপিয়ে খুনের ঘটনার মূল পাণ্ডাকে পাকড়াও করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে খতম হয় আরও এক দাগি দুষ্কৃতী। সকাল থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দিল্লিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে সন্ধ্যায় কলকাতা বিমানবন্দরে নামামাত্রই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী।
এনকাউন্টারের কার্যকারণ প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত সংযত ভঙ্গিতে বলেন— “এনকাউন্টার কেন এবং কীভাবে হয়েছে, তা তদন্তকারী পুলিশ প্রশাসন প্রেস মিট করে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানিয়ে দিয়েছে। একজন প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সেই আইনি বিষয়ে আমার বাড়তি মন্তব্য করা শোভা পায় না।” তবে ধুলিয়ানে দলীয় কর্মী খুনের মামলা বলে কি পুলিশ বাড়তি সক্রিয়তা দেখিয়েছে? বিরোধীদের এই অভিযোগ সপাটে উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— “নিহত ব্যক্তি কোন দলের কর্মী ছিলেন, সেটা কোনো বিষয় নয়। দুষ্কৃতীরা আইন হাতে তুলে নেবে আর আমাদের পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে— এটা এই জমানায় হতে পারে না!”
এরপরই রাজ্য পুলিশের মনোবল এক ধাক্কায় শীর্ষে তুলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নীতি স্পষ্ট করেন। শুভেন্দু অধিকারী জোর গলায় ঘোষণা করেন— “পুলিশকে দুটো ক্ষেত্রে ‘কমপ্লিটলি ফ্রি হ্যান্ড’ বা পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া রয়েছে। প্রথমত— মাদক বা নেশামুক্তি অভিযান, এবং দ্বিতীয়ত— মা-বোনেদের ওপর অত্যাচার ও নারী নির্যাতন। এই দুটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ পরিস্থিতি অনুযায়ী তৎক্ষণাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে না। বিধানসভার ভেতরে দাঁড়িয়ে আমি এই ছাড় ঘোষণা করেছিলাম। আর কর্তব্য পালন করতে গিয়ে আমার পুলিশ বন্ধুরা যদি কোনো আইনি বা রাজনৈতিক অসুবিধায় পড়েন, তবে পুলিশমন্ত্রী হিসেবে তাঁদের বাঁচাতে আমি নিজে সামনে দাঁড়িয়ে ঢাল হব!”
একই সাথে দুষ্কৃতী ও সমাজবিরোধীদের উদ্দেশ্যে শেষ সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন— বাংলা থেকে সমস্ত দাগি গুণ্ডাদের আইনানুগ প্রক্রিয়ায় চিরতরে নির্মূল করা হবে।
দিল্লিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে বৈঠকের পর কলকাতা নেমেই শুভেন্দু অধিকারীর এই আক্রমণাত্মক ও স্পষ্টবাদী অবস্থান এক চরম বার্তা দিল— অপরাধী যে দলের বা যে ধর্মেরই হোক না কেন, মাদক কারবার এবং নারী সুরক্ষার প্রশ্নে আপসের কোনো জায়গা বাংলায় থাকবে না!