নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের মহারণের ঠিক প্রাক্কালে, প্রচারের শেষ লগ্নে রচিত হলো এক ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় রাজনৈতিক পটচিত্র! যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে অতীতে পদ্মশিবিরের প্রচার ছিল কার্যত অকল্পনীয়, সেই খাস সংখ্যালঘু মহল্লাতেই আছড়ে পড়ল গেরুয়া প্লাবন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া ‘বন্ধুত্বের আহ্বানে’ সাড়া দিয়ে এবার রাজপথে নেমে এলেন সংখ্যালঘু ভাই-বোনেরা। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে একটাই স্লোগান— “আমরা মুখ্যমন্ত্রীর পাশে আছি, আমরা বন্ধুত্ব করতে চাই সরকারের সঙ্গে!” বিরোধী শিবিরের বহু দশকের কৃত্রিম ভয়ের পাঁচিল ভেঙে চুরমার করে দিয়ে রবিবার নন্দীগ্রাম ১ ব্লকে দেখা গেল শাসক ও সংখ্যালঘু সমাজের এক অভূতপূর্ব আন্তরিক মেলবন্ধন।
রবিবার ছিল নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রচারের শেষ রবিবার। বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের সমর্থনে নন্দীগ্রাম ১ ব্লকের হাজরাকাটা রাজরামচক থেকে এক সুবিশাল রোড শোয়ের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রথমে একটি হুডখোলা জিপে এবং পরবর্তীতে গাড়িতে চেপে জনসংযোগ করতে করতে তিনি এগিয়ে যান সামসবাদ মীরের বাজারের দিকে। রাস্তার দুধারে তখন দাঁড়িয়ে হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষ। কোথাও মুখ্যমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দেওয়া হলো ফুলের পাপড়ি, কোথাও পরিয়ে দেওয়া হলো উত্তরীয়। আর সবচেয়ে নজরকাড়া দৃশ্য ছিল সংখ্যালঘু পাড়াগুলির তরুণ ও প্রবীণদের হাতে থাকা পোস্টার— যেখানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল বর্তমান সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার অঙ্গীকার।
মুখ্যমন্ত্রীর রোড শোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে স্থানীয় সংখ্যালঘু নাগরিকরা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দেন অতীতের রাজনীতির বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা শেখ নাসির আহমেদ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন— “মুখ্যমন্ত্রী আমাদের বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতেই আজ আমরা সংখ্যালঘু ভাই-বোনেরা রাস্তায় নেমেছি।” আর এক বাসিন্দা শেখ জহিরুল আলম জানান— মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত ও আশ্বস্ত। এমনকি আব্দুল মালেক মল্লিক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন— “মুখ্যমন্ত্রী নিজে আমাদের মাঝে এসেছেন, এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবার বিজেপি প্রার্থী অন্তত দেড় লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবেন!”
রোড শো শেষে এই ঐতিহাসিক জনজোয়ার প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক সততা বজায় রেখে তিনি বলেন— “এই সংখ্যালঘু এলাকাটিতে ভারতীয় জনতা পার্টি সম্ভবত এই প্রথম কোনো কর্মসূচি করতে পারল। একুশ ও ছাব্বিশের বিধানসভা, চব্বিশের লোকসভা কিংবা তেইশের পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমি এখানে প্রচার করতে আসিনি; কারণ বাইরে থেকে লোক এনে কৃত্রিম মিছিল দেখানোর কোনো মানে হয় না। অতীতের নির্বাচনে এই সমস্ত বুথগুলিতে বিজেপি কার্যত শূন্য ভোট পেয়েছিল।”
এর পরেই বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে শুভেন্দু অধিকারী জানান— “এখানকার স্থানীয় সংখ্যালঘু বাসিন্দারাই আমাদের নেতৃত্বের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, মুখ্যমন্ত্রী যদি নিজে আসেন তবে তাঁরা পাশে দাঁড়াবেন। আজ প্রচারে বেরিয়ে মানুষের চোখের ভাষা দেখে আমার মনে হলো— আমার বন্ধুত্বের আহ্বান অনেকটাই কাজ করবে। হয়তো পুরোটা নয়, কিন্তু বরফ গলেছে। গণতন্ত্রে আপনি যদি এক পা হাত বাড়ান, তবে সরকার আপনার দিকে দশ পা এগিয়ে আসবে।”
ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের এতদিন যারা কেবল ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত, নন্দীগ্রামের এই ছবি তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— তোষণ নয়, সাধারণ মানুষ আজ ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের শরিক হতে চায়। হাজরাকাটা থেকে সামসবাদের এই জনসুনামি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিল— ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের ফলাফল শুধু কোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয় নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সংখ্যালঘু মেরুকরণের এক চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে চলেছে!
