বিগত সরকারের জমানায় পুজো অনুদান মানেই যেখানে পরিণত হয়েছিল তোষণ, রাজনৈতিক আনুগত্য কেনাবেচা আর করদাতাদের টাকার দেদার খয়রাতির এক নগ্ন প্রদর্শনীতে— পালাবদলের নতুন বাংলায় দাঁড়িয়ে এবার রচিত হলো আত্মমর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক নজিরবিহীন ইতিহাস! প্রতিটি পুজো কমিটির জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান ঘোষণার পরেও, খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটিমাত্র আন্তরিক আবেদনে সাড়া দিয়ে সেই সরকারি টাকা নিতে পরিষ্কার অস্বীকার করল রাজ্যের ২০০টি মেগা পুজো কমিটি! মহালয়ার দিন কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সের বর্ণাঢ্য সূচনামঞ্চ থেকে এই তথ্য প্রকাশ করে সেই সমস্ত পুজো উদ্যোক্তাদের রাজকীয় ধন্যবাদ ও কুর্নিশ জানালেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী।
ঘটনার প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মিলন মেলা প্রাঙ্গণে পুজো সমন্বয় বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন যে, রাজ্যের ছোট-বড় ক্লাবগুলির জন্য ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক অনুদান বরাদ্দ করবে সরকার। তবে সেই ঘোষণার সঙ্গেই এক অনন্য প্রশাসনিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে তিনি বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলির কাছে সরাসরি একটি আবেদন রেখেছিলেন। শুভেন্দুবাবু বলেছিলেন— “যাঁরা কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপনের জোরে কোটি কোটি টাকার বাজেট করেন, সেই সমস্ত বড় পুজো কমিটিগুলির কাছে আমার বিনীত আবেদন— আপনারা এই সরকারি আর্থিক সাহায্য নেবেন না। বরং সেই টাকা প্রান্তিক ও ছোট পুজোগুলির সার্বিক সুরক্ষায় কাজে লাগুক। যাঁরা টাকা নেবেন না, তাঁদের আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাব।”
আর মুখ্যমন্ত্রীর সেই আহ্বানে যে রাজ্যের ক্লাব সংস্কৃতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেল মহালয়ার মেগা ইভেন্টেই। ২০০টি প্রথম সারির মেগা পুজো কমিটি স্বেচ্ছায় লিখিতভাবে জানিয়ে দিল— তারা সরকারি অনুদানের এক লক্ষ টাকা নেবে না; নিজেদের পুজো তারা নিজস্ব সামর্থ্যেই পরিচালনা করবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যেখানে সরকারি অনুদান নেওয়ার জন্য বড় বড় ক্লাবগুলির মধ্যে কাড়াকাড়ি চলত, সেখানে ২০০টি প্রভাবশালী ক্লাবের এভাবে সরকারি সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা ক্লাব রাজনীতির খোলনলচে বদলে যাওয়ার এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ইডেনের মেগা মঞ্চ থেকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— “আমি বড় পুজো কমিটিগুলিকে আহ্বান জানিয়েছিলাম, আর সেই কথা রেখে ২০০টি ক্লাব সরকারি অনুদান নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এই আত্মমর্যাদাবোধ এবং সরকারের ডাকে সাড়া দেওয়ার এই মানসিকতার জন্য আমি তাঁদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাচ্ছি।”
একদিকে যখন খয়রাতি সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে ২০০টি ক্লাবের এই ঐতিহাসিক ত্যাগ, অন্যদিকে বিরোধীদের লাগাতার অপপ্রচারকে যোগ্য জবাব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এদিন আরও এক বিরাট পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন— পালাবদলের পর ডবল ইঞ্জিনের বাংলায় এবার ১২ হাজার ৪০০টি সম্পূর্ণ নতুন পুজোর শুভ সূচনা হয়েছে! যার মধ্যে কলকাতা পুলিশের অধীনে ৪০০টি এবং রাজ্য পুলিশের আওতায় ১২ হাজার নতুন পুজো অন্তর্ভুক্ত।
সব মিলিয়ে, মহালয়ার পূণ্যলগ্নে দাঁড়িয়ে ২০০টি মেগা ক্লাবের সরকারি অনুদান প্রত্যাহারের এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক স্তরে টাকার সাশ্রয় নয়; এ হলো সরকারি তোষণের সংস্কৃতি উপড়ে ফেলে বাংলার শারদোৎসবকে প্রকৃত অর্থে এক স্বাবলম্বী, দুর্নীতিমুক্ত ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ জনউৎসবে রূপান্তরের এক যুগান্তকারী মাইলফলক
