বুধবার দুপুর ১২টা ৭ মিনিট নাগাদ তারাতলায় প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে নির্মীয়মাণ একটি বিশাল গুদামের ছাদ ও লোহার কাঠামো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। সেই সময় নীচে কাজ করছিলেন অন্তত ৪০ জন শ্রমিক। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গোটা নির্মাণস্থল। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু শ্রমিক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এত বড় দুর্ঘটনার দায় কার? এই মৃত্যু কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল?
জানা গিয়েছে, জমিটি কলকাতা বন্দরের অধীন। ২০২৪ সালের ১ অগস্ট বেহরা ব্রাদার্স নামে একটি সংস্থাকে ৩০ বছরের জন্য জমিটি লিজ় দেওয়া হয়। সেই জমিতে গুদাম নির্মাণের কাজ চলছিল গত প্রায় দেড় বছর ধরে। কিন্তু কোনও লিজ় নেওয়া জমিতে বড় নির্মাণকাজ করতে গেলে একাধিক দফতরের অনুমতি লাগে। প্রশ্ন উঠছে, সেই সমস্ত অনুমোদন কি যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল?
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তিনি দাবি করেন, প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মনে হয়েছে, গুদামের নকশাতেই ত্রুটি ছিল। অথচ সেই নকশা চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভার অনুমোদন পেয়েছিল। যদি সত্যিই নকশা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে সেই নকশা যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হল কীভাবে? এই প্রশ্ন এখন সরাসরি পুরসভার দিকে আঙুল তুলছে।
ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাঁর দাবি, কাঠামোগত নকশা ভয়ঙ্কর রকম ভুল না হলে এভাবে একটি বড় নির্মাণ ভেঙে পড়তে পারে না। তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, নির্মাণকাজের সময় কোনও দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার বা সুপারভাইজার নিয়মিত তদারকি করছিলেন কি না। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা জরুরি। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন মত সামনে এসেছে। কেউ বলছেন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। আবার কেউ দাবি করছেন, টানা বৃষ্টির কারণে মাটি বসে যাওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী সেই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, যদি মাটি বসে যাওয়াই কারণ হত, তাহলে লোহার বিম এভাবে বেঁকে যেত না। বরং কাঠামোর নাট-বল্টু খুলে গিয়ে স্লিপ করার ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থাৎ, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কাঠামোগত ত্রুটি বা নির্মাণগত গাফিলতির সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার রাজনৈতিক দিকও সামনে এসেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত মে মাসেই একটি বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন এই নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারের ভূমিকা নিয়েও আগে থেকেই অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, সতর্কবার্তা আগে থেকেই থাকলে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হল না? কোনও প্রভাবশালী চক্র কি এই নির্মাণকে রক্ষা করছিল? অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনও আধিকারিকের ভূমিকা ছিল কি? নাকি গোটা ব্যবস্থার মধ্যেই ছিল গুরুতর ফাঁকফোকর? ইতিমধ্যে কলকাতা পুলিশ এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। বেহরা ব্রাদার্সের প্রতিনিধিদের ডেকে পাঠানো হয়েছে। ঠিকাদারের খোঁজও চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবে এতটুকু স্পষ্ট— একটি গুদামের ছাদ শুধু ভেঙে পড়েনি, ভেঙে পড়েছে নির্মাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বহু প্রশ্নের মুখোশও।