দুর্গাপুজোর আনন্দের শেষ লগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলা। ঢাকের সেই চেনা আওয়াজে এবার মিশেছে বিদায়ের সুর। যে মাকে ঘিরে এত দিনের আনন্দ, এত আবেগ, এত আয়োজন, সেই মাকেই এবার চোখের জলে বিদায় জানানোর পালা। কিন্তু বিসর্জনের সেই আবেগঘন মুহূর্তে যেন কোনওভাবেই বিঘ্নিত না হয় নিরাপত্তা, যেন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা কেড়ে নিতে না পারে উৎসবের আনন্দ, সেই লক্ষ্যেই এবার বাড়তি সতর্ক রাজ্য প্রশাসন। প্রতিমা বিসর্জনকে আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। আর সেই ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে বাজে কদমতলা ঘাটে পৌঁছে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বিসর্জনের মুহূর্ত শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালির আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে যে মাকে ঘিরে এত দিনের উচ্ছ্বাস, সেই মাকে বিদায় জানাতে ঘাটে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। কারও চোখে জল, কারও গলায় তখনও বাজে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি। এই আবেগের মুহূর্তে সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই ভিড় নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রতিমা নিরঞ্জনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
বাজে কদমতলা ঘাটে বিসর্জনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে গিয়ে প্রতিমা বহনকারীদের পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়েও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, যাঁরা প্রতিমা নিয়ে ঘাটে আসবেন, তাঁদের নাম ও পরিচয় কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই পরিচয় যাচাই করে নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, বিসর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্বে কে বা কারা প্রতিমা নিয়ে আসছেন, তা নিশ্চিত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে প্রতিমা স্পর্শ করার বিষয়টিও। তাঁর কথায়, “যাঁরা সনাতন ধর্ম মানেন, তাঁরাই প্রতিমাতে হাত দেবেন। এটার মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িকতা নেই।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিসর্জনের ধর্মীয় রীতি ও মানুষের বিশ্বাসের বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। প্রতিমা বিসর্জনের মতো সংবেদনশীল পর্বে ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি যাতে কোনও ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা অশান্তির পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে দিকেও নজর রাখছে প্রশাসন।
এবার বিসর্জনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকছে বাড়তি নজরদারিও। সাধারণত কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনই বিসর্জন পর্বের নিরাপত্তা ও তদারকির দায়িত্ব সামলায়। তবে এবার সেই নিরাপত্তাবলয় আরও আঁটসাঁট করতে কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি মোতায়েন থাকবে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ। ঘাটে ভিড় সামলানো, সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
প্রতিমা বিসর্জনের সময় ঘাটে মানুষের ঢল নামে। প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার তাড়া, ভিড়ের চাপ, জলে নামার সময় অসতর্কতা সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকতে হবে। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা, নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানো এবং ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, উৎসবের আনন্দ যেন কোনও পরিবারের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের পাশাপাশি প্রত্যেক মানুষেরও।
মা দুর্গার বিসর্জন মানেই একদিকে মনখারাপ, অন্যদিকে নতুন করে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। সিঁদুরখেলা, ঢাকের বাদ্যি আর চোখের জলে মাকে বিদায় জানানোর সেই চেনা দৃশ্যের সাক্ষী হতে এবারও ঘাটে ভিড় জমাবেন অসংখ্য মানুষ। তাঁদের আবেগ ও বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেই বিসর্জন পর্বকে নিরাপদ করে তোলার লক্ষ্য প্রশাসনের। শেষ পর্যন্ত একটাই প্রার্থনা নিরাপদে সম্পন্ন হোক মায়ের বিদায়, অক্ষুণ্ণ থাকুক উৎসবের মর্যাদা, আর প্রতিটি মানুষের মনে বেঁচে থাকুক সেই চেনা আশ্বাস, ‘আসছে বছর আবার হবে।’
