মাঝরাস্তায় স্কুটি থামিয়ে সোজা প্রশ্ন— “বউটা কার?” আর সেই উত্তপ্ত বাক্যবাণের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত মানুষের চোখের সামনে এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাকে সপাটে কষিয়ে চড় এক যুবকের! উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া পুরসভা এলাকায় ঘটে যাওয়া এই চরম নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে প্রকাশ্য রাস্তায় মেলামেশা ও ঘোরাঘুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই পারিবারিক ও সামাজিক বিবাদ নিমেষের মধ্যে মোড় নিয়েছে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে। শাসকদলের পক্ষ থেকে এই হামলার পেছনে বিরোধী দল বিজেপির উসকানিকে কাঠগড়ায় তোলা হলেও, বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক শোরগোল।
ঠিক কী ঘটেছিল উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ায়? স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য ও ভাইরাল ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছে এক নাটকীয় দৃশ্য। হাবড়া পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর রুমকি সরকার এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতা আসিফ শেখ— দু’জনে একটি স্কুটিতে চড়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়ই পথিমধ্যে আচমকা এক ক্ষুব্ধ যুবক তাঁদের স্কুটির পথ আটকে দাঁড়ায়। স্কুটি থামানো মাত্রই আসিফ শেখের দিকে তেড়ে গিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে ওই যুবক। বাকবিতণ্ডা চলাকালীনই নেতাকে লক্ষ্য করে যুবকটি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— “বউটা কার?” মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তর্কাতর্কির চরম পর্যায়ে প্রকাশ্য রাজপথেই তৃণমূল নেতা আসিফ শেখের গালে কষিয়ে চড় মেরে বসে ওই যুবক। ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত হয়ে পড়েন উপস্থিত পথচারীরা, আর সেই সুযোগেই চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে শুরু হয় নেতাকে চরম হেনস্থা।
ভিডিওটি ভাইরাল হতেই সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মহল। ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ক বা সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কীভাবে একজন জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকে প্রকাশ্য রাস্তায় হেনস্থা ও শারীরিক নির্যাতন করা হতে পারে— সেই প্রশ্ন যেমন উঠছে, তেমনই এই ঘটনাকে শাসকদলের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তৃণমূলের ‘কর্মফল’ বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে গেরুয়া শিবির।
ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হাবড়ার স্থানীয় বিজেপি নেতা দেবজ্যোতি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন— “এগুলি সবটাই তৃণমূলের দুর্নীতির মতো তাঁদের চারিত্রিক কর্মফল। হাবড়ার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি সাধারণ মানুষ তাঁদের বহু দিন ধরেই ‘লায়লা-মজনু’ হিসেবে চেনে। তবে একজন নাগরিক হিসেবে কারও গায়ে এভাবে সরাসরি হাত দেওয়াকে আমরা কখনোই সমর্থন করি না।”
এখানেই থেমে থাকেননি বিজেপি নেতা। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুমকি সরকারের প্রয়াত স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি আরও গভীর অভিযোগের আঙুল তোলেন। বিজেপি নেতার বক্তব্য— “কাউন্সিলর রুমকি সরকারের স্বামী রাজীব সরকারও জীবিতাবস্থায় এই অনৈতিক সম্পর্কের তীব্র বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীতে রাজীববাবুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এলাকায় শোনা গিয়েছিল তিনি নাকি আত্মহত্যা করেছেন; কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল— সেই রহস্যের ধোঁয়াশা আজও কাটেনি। তাই প্রকাশ্য রাস্তায় এই চড় মারার ঘটনা আসলে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক মারাত্মক বহিঃপ্রকাশ!”
ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংঘাত, অতীতের এক রহস্যজনক মৃত্যুর স্মৃতি আর রাজপথের প্রকাশ্য নিগ্রহ— সব মিলিয়ে হাবড়ার এই ভাইরাল চড় কাণ্ড এখন শুধুই কোনো সামাজিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা তৃণমূল ও বিজেপির কাদা ছোঁড়াছুড়ির এক নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে!