ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও কমিশনের বিতর্কিত ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক উত্তাপ। বিরোধীদের অভিযোগ—সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ইস্যুতে একজোট হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
বিতর্কের আগ্নেয়গিরিতে পেট্রোল ঢেলেছে একটি সংবাদমাধ্যমের এক বিস্ফোরক তদন্তমূলক রিপোর্ট। রিপোর্টে পরিষ্কার জানা গেছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের নেওয়া অন্তত ১৪টি একতরফা সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নিজের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার।
বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও অসমের মতো রাজ্যগুলোতে লক্ষ লক্ষ বৈধ ও যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ সংস্থাকে কীভাবে একটি দলদাসের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে, কমিশনের অন্দরের এই গৃহযুদ্ধই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য স্পষ্ট—জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের পর থেকেই একের পর এক রাজ্যে বিজেপির রহস্যজনক ভোট বৃদ্ধি ঘটেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, ‘বাংলার ভোট লুট করা হয়েছে’ এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করেছে। তিনি নতুন করে নিরপেক্ষ পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সিইসি-র বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অবমাননার অভিযোগে FIR দায়ের করেছেন। রাহুল গান্ধী এই ঘটনাকে ‘দেশের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে তোপ দেগেছেন। যদিও নিজেদের পিঠ বাঁচাতে কমিশন এই অসন্তোষকে ‘স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ভিন্নমত’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি এবার ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও সামাজিক সংগঠনগুলোও রাজপথে নেমেছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দিল্লির বুক থেকে তীব্র হুঙ্কার দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘দেশের সবচেয়ে বড় দেশদ্রোহী’ বলে তকমা দিয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের না করা হয়, তবে দেশজুড়ে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে ও সৌরভ দাসেরা অভিযোগ করেছেন, বিজেপির নির্বাচনী সাফল্যের মূল নেপথ্য কারিগর হলেন এই জ্ঞানেশ কুমার। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে বিতর্কিত এসআইআর বাতিল করে আগের ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন বাতিল করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা আজ এক চরম ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া আর দেশদ্রোহিতা সমার্থক। বিজেপি সরকারের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে স্বশাসিত নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।