পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিজের হাতেই রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে শিক্ষাদপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন।
উচ্চশিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং স্কুলশিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দীপক বর্মনকে। রাজনৈতিক মহলের মতে, দু’জনেই দীর্ঘদিনের সংঘ পরিবার বা আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
কেন এই জল্পনা?
কারণ গত কয়েক বছর ধরেই বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের বিভিন্ন স্তর থেকে অভিযোগ উঠেছে যে দেশের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ভারতের প্রকৃত ঐতিহ্য, সভ্যতা এবং সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যথাযথভাবে স্থান পায়নি। কয়েকদিন আগেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা ভারতের গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট জানে না। তাঁর বক্তব্য, তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন।
সেই প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরেন প্রাচীন ভারতের নানা মনীষীর নাম।ব্যাকরণবিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদ পাণিনি, সংস্কৃত সাহিত্যের মহাকবি কালিদাস, বৈদিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির নানা দিকের উল্লেখ করেন তিনি। শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট। তাঁর মতে, বাঙালির পরিচয়ের আগে রয়েছে ভারতীয় পরিচয়। জাতীয় চেতনা এবং রাষ্ট্রবাদের ধারণা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এই বক্তব্য অবশ্য নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বহুবার দেশের ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উপেক্ষিত হয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে অসংখ্য বিপ্লবীর অবদান, প্রাচীন ভারতের বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সাফল্য এবং সনাতন ভারতের ঐতিহ্যকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কি সেই ভাবনাই এবার শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হতে চলেছে? নতুন শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম দিকের বক্তব্যও সেই জল্পনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেন, একসময় জ্ঞানচর্চা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের কাছে পথপ্রদর্শক ছিল। আগামী পাঁচ বছরে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে ফের দেশের সেরা জায়গায় পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ রাষ্ট্রবাদকে সমর্থন করেই এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। সেই রাষ্ট্রবাদের ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে এবং ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করা হবে। অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো বা প্রশাসনিক সংস্কার নয়, আদর্শগত বা ভাবনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
গত এক দশকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে একাধিক বিতর্কে জড়িয়েছে শিক্ষা দপ্তর। আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়েছে বহু নিয়োগ। চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একদিকে যেমন স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অন্যদিকে তেমনই শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পাঠ্যক্রম সংস্কার। উল্লেখযোগ্যভাবে, বামফ্রন্ট আমলে স্কুলশিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা আলাদা দপ্তর হিসেবে পরিচালিত হত। পরে তৃণমূল আমলে ধীরে ধীরে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং শিক্ষাক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কেন্দ্রীভূত হয়। এবার আবার দুই পৃথক নেতার হাতে দুই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির একটি স্পষ্ট বার্তাও হতে পারে। তাহলে কি আগামী দিনে বাংলার পাঠ্যবইয়ে আরও বেশি জায়গা পাবে বৈদিক সভ্যতা, সনাতন ভারতের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের অপ্রচলিত অধ্যায় এবং জাতীয়তাবাদের ধারণা? নাকি বিরোধীদের শিক্ষা হয়ে উঠবে মতাদর্শগত লড়াইয়ের নতুন মঞ্চ? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আর সেই পরিবর্তন কতটা পাঠ্যবইয়ে, কতটা শ্রেণিকক্ষে এবং কতটা ছাত্রছাত্রীদের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সকলের।
