‘আপনারা বাংলা নিয়েছেন, আমরা দিল্লি নেব।’ শ্রীরামপুরের সভামঞ্চ থেকে এই বার্তাতেই কার্যত নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর নিশানায়? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। SIR নিয়ে বিতর্কের আবহে জ্ঞানেশকে আক্রমণ করে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সুর আরও চড়ালেন তৃণমূল নেত্রী।
ভাবুন তো, একটা নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু ভোট মিটে যাওয়ার পরও বিতর্ক থামছে না। বরং এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা, SIR এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। আর ঠিক এই জায়গাতেই শ্রীরামপুরের সভা থেকে মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ—SIR-এর নামে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ। নির্বাচন কমিশন এর আগে SIR নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছিল।
এবার আসি জ্ঞানেশ কুমার প্রসঙ্গে। সভামঞ্চ থেকে মমতা তাঁকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন। কেন এই নাম? মমতার ব্যাখ্যা, ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ থেকেই তিনি এই নাম ব্যবহার করেছেন। তাঁর দাবি, শুধু জ্ঞানেশ কুমার নয়, আরও যাঁদের বিরুদ্ধে অন্যায়ের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও আগামী দিনে ব্যবস্থা নেওয়ার লড়াই চলবে।
আর এখানেই প্রশ্নটা আপনাদের জন্য—এই লড়াই কি শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে? মমতার বক্তব্য শুনলে, বিষয়টি তার থেকেও বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের আকার নিচ্ছে।
সভা থেকে তিনি অভিযোগ করেন, SIR-এর মাধ্যমে প্রায় ৯২ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। Form 6 নিয়েও তিনি একাধিক দাবি তোলেন। তাঁর আরও অভিযোগ, গরিব মানুষের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে এই সংখ্যাগুলি এবং অভিযোগগুলির স্বতন্ত্র সরকারি যাচাই এই বক্তব্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এরপরই মমতার আক্রমণের পরিধি আরও বাড়ে। হকার উচ্ছেদ নিয়েও সরব হন তিনি। তাঁর দাবি, গরিব মানুষের রুটি-রোজগার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হকারদের হয়ে আদালতে লড়াই করার কথাও জানান তিনি। বিকল্প কর্মসংস্থান এবং ক্ষতিপূরণের দাবিও তোলেন।
কিন্তু সভার শেষদিকে ফের মূল রাজনৈতিক সুরে ফিরে যান মমতা। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার জবাব গণতান্ত্রিকভাবেই দেওয়া হবে। আর সেই জায়গা থেকেই তাঁর চ্যালেঞ্জ—বাংলা যদি আপনারা নিয়ে থাকেন, তাহলে দিল্লি আমরা নেব।
শ্রীরামপুরের সভাটি অবশ্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যের জায়গা ছিল না। এই সভার অনুমতিও আদালতের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে মিলেছিল। কোর্ট ময়দানে সভার জন্য নির্দিষ্ট সময়, সর্বোচ্চ এক হাজার মানুষের উপস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একাধিক শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
ফলে একদিকে SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশন বনাম বিরোধীদের টানাপোড়েন, অন্যদিকে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে মমতার পালটা চ্যালেঞ্জ—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল শ্রীরামপুরের এই সভা।
এখন দেখার, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে এই আন্দোলন কতদূর গড়ায়, বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমন্বয় কতটা বাড়ে এবং মমতার ‘দিল্লি নেওয়ার’ চ্যালেঞ্জ আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে কী নতুন বার্তা তৈরি করে।