ক্ষমতার পরিবর্তন হতেই বাংলায় এবার ঝড়ের গতিতে ঘুরতে চলেছে শিল্পের চাকা। আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে নারাজ রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। যার জেরে বুধবার মহাকরণে পা দিয়েই কার্যত হুঙ্কার ছাড়লেন নতুন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী তাপস রায়। দায়িত্ব নিয়েই গত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার তথাকথিত ‘শিল্প-উন্নয়ন’-এর মুখোশ টেনে খুলে দিলেন তিনি। একই সাথে দিলেন সবথেকে বড় ইঙ্গিত— বাংলায় নাকি ফের ফিরছে টাটারা! তবে কি আবার সিঙ্গুরে উড়বে টাটাদের বিজয়পতাকা? এ প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক, কারণ দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই নিজের দফতরের উচ্চপদস্থ আমলা ও আধিকারিকদের ডেকে ৩ দফা কড়া নির্দেশ দিয়েছেন নতুন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। দেওয়া হয়েছে ফাইল খোলার নির্দেশও! কিন্তু সেই ৩ নির্দেশ কি কি?
✓ প্রথমত, যে সমস্ত শিল্পপতি বা বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী রাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন, তারা কারা এবং ঠিক কী কারণে বাংলা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন—সে বিষয়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা তৈরি করতে হবে। সরকারি সূত্রে খবর, বিগত জমানার অপশাসনে প্রায় ৬,৬৮৮ জন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী বাংলা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
✓ দ্বিতীয়ত, বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন বা BGBS-এর হাটে হাঁড়ি ভাঙার নির্দেশ। অর্থাৎ, দিদির আমলে ঘটা করে যে সব কোটি কোটি টাকার মৌ তথা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল, তার বর্তমান পরিস্থিতি কী? কাজ আদৌ হয়েছে নাকি সবটাই ছিল ভাঁওতা? তা লিস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন তাপস রায়।
✓তৃতীয়ত, টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন।
এদিন তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে নয়া শিল্পমন্ত্রী সাফ জানান, “গত ১৫ বছরে রাজ্যে শিল্পও হয়নি, আর কৃষিও নষ্ট হয়েছে। স্পেনে গিয়ে সামনে হাঁটলেন, পিছনে হাঁটলেন, এই সব করলেন। বিজিবিএস বা পিসিবিএস নামে কিসব করেছেন! কয়েকবার বিজিবিএস করা আসলে স্রেফ লোক দেখানো ছিল, মানুষকে ভাঁওতা দেওয়ার বিষয় ছিল। আমরা অবশ্যই শিল্পের জন্য সম্মেলন করবো, তবে সেটা কীভাবে এবং কতখানি কাজের হবে, তা পরে ঠিক হবে।” পাশাপাশি তিনি এও মন্ত্রীর স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সিঙ্গুরে টাটারা চাইলে শুধু গাড়ি কারখানা নয়, তাদের অন্যান্য ব্যবসার বিপুল বিনিয়োগের জন্যও বাংলায় জায়গা পাবেন। প্রয়োজনে তিনি নিজে গিয়ে টাটা কর্তাদের সাথে কথা বলবেন বলেও এদিন দাবি করেন। এছাড়া, শিল্পের জন্য জমি জট কাটাতে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ‘ল্যান্ড পলিসি’ আনা হচ্ছে বলেও জানান তাপস রায়।
বলা রাখা ভালো যে, ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাংলায় শিল্পের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে। আর সরকার গড়তেই তার বাস্তবায়ন শুরু। আগামী ১৩ তারিখ এ রাজ্যে আসছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সাঁকরাইলের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে আমুল গোষ্ঠীর তরফ থেকে তৈরি ৬৫০ কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগের একটি আধুনিক কারখানার উদ্বোধন করতে চলেছেন তিনি। এহেন কর্মকান্ডে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডবল ইঞ্জিন সরকারের হাত ধরে এটাই বাংলার বুকে শিল্পের প্রথম মহাজাগরণ! আর এই মেগা প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন খোদ শিল্পমন্ত্রীও। তবে, বিজেপি সরকারের এহেন পদক্ষেপগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, পরিবর্তনের পর নতুন সরকার কিন্তু স্রেফ কথায় নয়, কাজে সমান বিশ্বাসী। সিন্ডিকেট রাজ খতম করে, তোলাবাজি বন্ধ করে পশ্চিমবঙ্গকে প্রকৃত শিল্পবান্ধব করে তোলাই এখন লক্ষ্য মুখ্যমন্ত্রী-সহ গোটা ক্যাবিনেটের। আর সেই জয়যাত্রা শুরু হলো আমুলের হাত ধরে। এবার দেখার টাটাদের প্রত্যাবর্তনে কতটা পূর্ণতা পায়।