তৃণমূলের প্রতীকে জিতে পরে দল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক সমীকরণে যাওয়া ২০ জন লোকসভা সাংসদকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। আর এই আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দায়ের করা রিট আবেদনের ভিত্তিতেই শীর্ষ আদালত বিদ্রোহী সাংসদদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সংঘাত এবার সরাসরি আইনি ময়দানে পৌঁছে গেল।
ঘটনার সূত্রপাত, ওই ২০ সাংসদের দলবিরোধী অবস্থান এবং অন্য রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। তাঁরা ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঘোষণা করেন এবং সংসদে আলাদা গোষ্ঠীর স্বীকৃতি দাবি করেন। পাশাপাশি তাঁদের এনডিএর বিভিন্ন বৈঠকেও দেখা যায়। তৃণমূলের অভিযোগ, যে প্রতীকে ভোটে জিতে সাংসদ হয়েছেন, সেই দল ছেড়ে অন্য জোটে যোগ দেওয়া দলত্যাগ বিরোধী আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিদ্রোহী শিবির অবশ্য নিজেদের অবস্থানকে আইনসম্মত বলে দাবি করছে।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের তরফে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে আগেই সাংসদ পদ বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর আবেদনের জেরেই এবার আদালতের নোটিশ। অর্থাৎ, এতদিন যে রাজনৈতিক চাপের কথা বলা হচ্ছিল, তা এবার বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও ঢুকে পড়ল।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। স্পিকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, সংশ্লিষ্ট সাংসদদের ইতিমধ্যেই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আদালত জানিয়ে দেয়, শুধু নোটিশ পাঠানোই যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শুনানি এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যবেক্ষণেই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
নোটিশ পাওয়া সাংসদদের মধ্যে রয়েছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশচন্দ্র বর্মা বাসুনিয়া, পার্থ ভৌমিক, অরূপ চক্রবর্তী, দেব, সায়নী ঘোষ, বাপি হালদার, মহম্মদ আবু তাহের খান, কালীপদ সরেন খেরওয়াল, অসিত কুমার মাল, জুন মালিয়া, মিতালী বাগ, খলিলুর রহমান, মালা রায়, শর্মিলা সরকার এবং ইউসুফ পাঠান।
তবে আদালতের নোটিশ মানেই এখনই কারও সাংসদ পদ বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্য এবং অভিযোগের জবাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তারপরই নির্ধারিত হবে মামলার পরবর্তী গতিপথ। মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের পদক্ষেপকে তৃণমূলের আইনি জয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সবচেয়ে বড় বিষয়, অভিষেকের আবেদন এবার এমন একটি প্রক্রিয়াকে গতি দেওয়ার চেষ্টা করছে, যার ফল সরাসরি ২০ সাংসদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁরা নিজেদের অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করেন, স্পিকার কী সিদ্ধান্ত নেন এবং সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী শুনানিতে কী নির্দেশ দেয়—এই তিন দিক এখন নজরের কেন্দ্রে। তাই নোটিশের পর রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ বদলে গিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আদালত। এই কারণেই বিষয়টি শুধু দলবদলের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নির্বাচিত সাংসদদের দলীয় পরিচয়, পদ ধরে রাখার অধিকার এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের প্রয়োগ—সবকিছু নিয়েই এবার গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি হতে পারে আগামী দিনে।