হিন্দু হয়েই বাঁচতে চাই তাই মোল্লা থেকে হলেন রায় ! এই ঘটনা যেন ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সত্য আর বিশ্বাসের রূপকথা

ধর্ম— শব্দটা মাত্র দুটি অক্ষরের, কিন্তু এর ব্যাপ্তি ও অনুভূতি মানুষের জীবনে কতখানি গভীর হতে পারে, তা চুঁচুড়ার বাসিন্দা সামিরউদ্দিন মোল্লার জীবনকাহিনি না শুনলে হয়তো বিশ্বাস করা কঠিন। পেশায় লেডি ডাফরিন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের আইটি কর্মী এই মানুষটি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ধর্ম কোনো জন্মসূত্রে পাওয়া গণ্ডি নয়, বরং নিজের আত্মিক বিশ্বাস, ভালোবাসা আর সত্যের পথে চলার নাম।

বাবার সূত্রে মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও, সামিরউদ্দিনের শৈশব কেটেছে দিদিমার স্নেহে, এক সনাতন হিন্দু পরিবারের প্রভাবে। দিদিমার সাথে লক্ষ্মী পুজো, গণেশ পুজোর যোগাড় করে দেওয়া, ফুল আনা, কিংবা নাড়ু বানানোর গল্প থেকে শুরু হয়েছিল এক পরম আবেগের টান। মামার বাড়ির সেই পুজো, অসুর বধের গল্প আর দেব-দেবীর ভাবাবেগ ছোটবেলাতেই তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দিদিমার সেই পুজো ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ থেকে সামিরউদ্দিনের মনে প্রশ্ন জাগে— মনে তো আমি হিন্দু আছই, তবে নামে কেন মুসলিম হয়ে থাকব?

আর এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রাম। ২০১০ সাল থেকে নিজের নাম ও পরিচয় আইনগতভাবে পরিবর্তন করার জন্য লড়াই শুরু করেন তিনি। বহু উকিল ধরা, ঠকে যাওয়া, এমনকি নিজের মাটির ব্যাংক বা ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’ ভেঙে জমানো খুচরো পয়সা দিয়ে আইনি লড়াই চালানোর মতো ঘটনাও ঘটে তাঁর জীবনে। ১৬ বছরের দীর্ঘ লড়াই আর প্রশাসনিক কাঠখড় পোহানোর পর অবশেষে সামিরউদ্দিন মোল্লা রূপ নেন ‘সমীর রায়’-এ। কোরআন, বাইবেল এবং গীতা— তিনটি ধর্মগ্রন্থই গভীর মনোযোগে পড়েছেন সমীর। আর সেই জ্ঞান থেকেই তাঁর উপলব্ধি— “শাস্ত্র নয়, আসল হলো মানুষের কর্ম। পৃথিবী ছেড়ে গেলে ধর্ম মনে রাখবে না, মনে রাখবে কর্ম।”

এই দীর্ঘ যাত্রায় সমীরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর স্ত্রী স্মিতা। ভালোবাসার বিয়ের পর পরিবার থেকে স্ত্রীকে ধর্ম পরিবর্তনের চাপ দেওয়া হলেও, সমীর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন— স্মিতা তাঁর নিজস্ব পরিচয়েই বাঁচবে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরে প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে দিন শুরু করা সমীরের কাছে ধর্ম কোনো সামাজিক রাজনীতি নয়, বরং আত্মিক শান্তির স্থান। ধর্মের সীমানা পেরিয়ে কর্ম আর ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা সমীর রায়ের এই পথচলা আজকের সমাজের কাছে সত্যিই এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *