২০২৬-এর ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনের সময় তীব্র দাবদাহ আর অসুস্থতাকে তুচ্ছ করে যিনি গোটা রাজ্য চষে বেড়িয়েছিলেন, সেই জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা তথা বিজেপির কেন্দ্রীয় কোর কমিটির সদস্য মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তীকে এবার রাজ্য প্রশাসনের অন্যতম শীর্ষ পদে বসাল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার! নিছক কোনো আলংকারিক পদ নয়— এক্কেবারে ক্যাবিনেট বা পূর্ণমন্ত্রীর সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়ে তাঁকে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মুখ্য উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত করল নবান্ন। বৃহস্পতিবার রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালের স্বাক্ষর সংবলিত সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এই নিয়োগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
বেশ কিছুদিন আগে নিউটাউনে মহানায়ক উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, বাংলার সংস্কৃতি জগতকে তৃণমূল জমানার সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক দলীয়করণের হাত থেকে মুক্ত করতে মিঠুন চক্রবর্তীকে ‘সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেই নবান্ন স্পষ্ট জানিয়ে দিল— অবিলম্বে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিয়োগ কার্যকর থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে— ‘জনস্বার্থে’ এবং বাংলার সাংস্কৃতিক বিকাশকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সাংগঠনিক ও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে আলিপুরদুয়ারে রয়েছেন মিঠুন চক্রবর্তী। সেখান থেকেই নতুন দায়িত্ব পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মহাগুরু দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন— “আমরা বাংলার মানুষকে কথা দিয়েছিলাম সোনার বাংলা গড়ে তুলব। সেই লক্ষ্যেই দিনরাত কাজ করব। শিল্প, সিনেমা ও লোকসংস্কৃতির হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে সবরকম চেষ্টা করা হবে।”
বাংলার চলচ্চিত্র দুনিয়ার সঙ্গে মিঠুন চক্রবর্তীর নাড়ির টান পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ থেকে শুরু করে বলিউডের ডিস্কো ড্যান্সার কিংবা বাংলা সিনেমার একের পর এক ব্লকবাস্টার— ভারতীয় চলচ্চিত্রের তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। বিগত সরকারের আমলে টলিপাড়ার স্টুডিওপাড়ায় যে দলীয় খবরদারি, প্রযোজক-পরিচালকদের কোণঠাসা করা এবং কাটমানির সংস্কৃতি জেঁকে বসেছিল, সেই অচলাবস্থা ভেঙে এবার পেশাদারিত্ব ফেরাতে সরকার তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাতে চাইছে। শুধু তাই নয়, মহানায়ক উত্তম কুমারের আসন্ন জন্মশতবর্ষ উদযাপন থেকে শুরু করে রাজ্যের ১,০০০ কোটি টাকার মেগা পর্যটন সার্কিট প্রকল্পের রূপরেখা তৈরিতেও সক্রিয় পরামর্শ দিচ্ছেন মিঠুন চক্রবর্তী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব তথা মাটির মানুষের প্রতিনিধিকে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় সংস্কৃতি দপ্তরের মাথায় বসিয়ে শুভেন্দু সরকার এক ঢিলে একাধিক শিকার করল। এতে একদিকে যেমন টলিউডের ওপর বিগত জমানার ভয়ের সংস্কৃতি চুরমার হবে, তেমনই রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিনোদন জগতের সম্পর্ক আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়ে উঠবে। শিল্পীদের অধিকার রক্ষা আর বাংলার ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লড়াইয়ে ‘মহাগুরু’র এই নয়া ইনিংস যে এক বৈপ্লবিক মোড় আনতে চলেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না!