একদিকে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে ভারতের প্রথম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বুলেট ট্রেন!রেলমন্ত্রীর প্রস্তাবে সায় দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক

আত্মনির্ভর ভারতের মুকুটে জুড়তে চলেছে নয়া পালক। এবার সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে ভারতের প্রথম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বুলেট ট্রেন। শুধু তাই নয়, দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি আনতে এবার আরও বড় পরিকল্পনা কেন্দ্রের। দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত প্রস্তাবিত বুলেট ট্রেন করিডর সম্প্রসারিত করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অসমের গুয়াহাটি পর্যন্ত। আর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে লাভবান হবে পশ্চিমবঙ্গও। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাইস্পিড রেল যোগাযোগের কেন্দ্র।
ইতিমধ্যেই বেঙ্গালুরুর BEML কারখানায় পুরোদমে চলছে দেশের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বুলেট ট্রেন তৈরির কাজ। রবিবার সেই কাজ সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে কারখানায় পৌঁছন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। ট্রেন তৈরির অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরবর্তীতে একটি ভিডিও বার্তায় এই প্রকল্পের নানা খুঁটিনাটি তুলে ধরেন রেলমন্ত্রী। ভারতীয় রেলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারতীয় রেলের তরফে এই বুলেট ট্রেনের নাম দেওয়া হয়েছে B28। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই হাইস্পিড ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮০ কিলোমিটার গতিবেগে চলার উপযোগী করে ডিজাইন করা হচ্ছে। যদিও বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু হলে ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনসেটে থাকবে আটটি করে কোচ। প্রাথমিক পর্যায়ে এমন দুটি ট্রেনসেট তৈরির পরিকল্পনা করেছে রেল। অর্থাৎ বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে এবার নিজেদের প্রযুক্তিতেই দ্রুতগতির রেল পরিষেবা গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে ভারত।

তবে বুলেট ট্রেন ঘিরে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নর্দান বুলেট ট্রেন করিডর তৈরির কথা ছিল। কিন্তু এবার সেই পরিকল্পনার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। শিলিগুড়ি পেরিয়ে করিডর পৌঁছবে গুয়াহাটি পর্যন্ত। প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডর উত্তরপ্রদেশ ও বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে অসমের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসতে পারে আমূল পরিবর্তন।
এই সম্প্রসারণের ফলে শিলিগুড়ির গুরুত্বও কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতদিন প্রস্তাবিত করিডরের শেষ প্রান্ত হিসেবে শিলিগুড়ির কথা ভাবা হলেও নতুন পরিকল্পনায় এই শহর হয়ে উঠবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ট্রানজিট হাব। অর্থাৎ শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য প্রান্তের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বর্তমানে দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছতে ট্রেনে প্রায় ২০ ঘণ্টা সময় লাগে। বুলেট ট্রেন চালু হলে সেই যাত্রার সময় কমে প্রায় ছয় ঘণ্টা হতে পারে। অন্যদিকে দিল্লি থেকে গুয়াহাটি পৌঁছনো সম্ভব হতে পারে আট ঘণ্টারও কম সময়ে।

এই সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। রবিবার সমাজমাধ্যমে তিনি জানান, গুয়াহাটি পর্যন্ত নর্দান বুলেট ট্রেন করিডর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে দিল্লি-শিলিগুড়ি করিডরেই প্রকল্পটি সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের কাছে আবেদন জানান। সেই প্রস্তাবে সম্মতি মেলায় কেন্দ্রকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে বুলেট ট্রেনের এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে বাংলার উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের মানচিত্র। শিলিগুড়ি থেকে অসমের মধ্যে দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। উত্তরবঙ্গের পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে পৌঁছনো যেমন সহজ হবে, তেমনই অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারের সঙ্গে বাংলার ব্যবসায়িক যোগাযোগও আরও মজবুত হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে প্রকল্পটি পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *