বঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথমবার মতুয়া সমাজের পুণ্যভূমি ঠাকুরনগরে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী! আর ঠাকুরবাড়ির সেই পবিত্র মাটিতে আয়োজিত গোঁসাইদের মহা সম্মেলনে দাঁড়িয়েই মতুয়া শরণার্থী ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করলেন তিনি। দীর্ঘ কয়েক দশকের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা আর রাজনৈতিক দোলাচলের অবসান ঘটিয়ে শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দিলেন— বিগত তৃণমূল জমানার সমাপ্তির সঙ্গেই শেষ হয়ে গিয়েছে মতুয়া সমাজের প্রতি বঞ্চনার কালো অধ্যায়। ডবল ইঞ্জিন সরকারের নেতৃত্বে এবার মতুয়াদের জীবনে স্থায়ী সুরক্ষা, সম্মান ও নাগরিকত্বের এক নতুন সোনালী ভোরের সূচনা হতে চলেছে।
ঠাকুরনগরের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে নিজের পারিবারিক শিকড় ও উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন— “আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়ে এই অবিভক্ত বাংলার বুকে উদ্বাস্তু হয়েছি। আমার নিজের মা-ও বরিশালের উদ্বাস্তু ছিলেন। শুধুমাত্র হিন্দু পরিচয়ের অপরাধে ওপার বাংলা থেকে তৎকালীন দাঙ্গাবাজরা এক কাপড়ে আমাদের পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছিল।” এরপরই বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে শুভেন্দু বলেন— “বাংলাদেশের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে যারা আমাদের এই দেশকে, আমাদের বাংলাকে অশান্ত করতে চাইছে— সেই দিমাগি নকশাল, মাওবাদী আর সমাজবিরোধী আরশোলা-ছারপোকারা আজ একজোট হয়েছে। আমরা আর কোনোদিন নিজেদের মাটিতে উদ্বাস্তু হব না। কেন্দ্র আর রাজ্য মিলে এদের সমূলে উপড়ে ফেলা হবে।” লোকগানের পঙতি উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘সোনার গৌড়’ আখ্যা দিয়ে তিনি জানান— “ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আর তো পাব না; মোদিজির হাত শক্ত করেই এই লড়াই আমরা জিতব।”
বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সনাতনী হিন্দু ও মতুয়াদের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় নির্যাতনের প্রসঙ্গও এদিন সভার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ— সেই সময় ওপার বাংলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা নির্যাতিত হিন্দুদের আশ্রয় দেওয়ার বদলে পূর্বতন সরকারের পুলিশ তাঁদের সীমান্ত এলাকা থেকে বেছে বেছে জেলে পুরেছিল। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সিএএ সংক্রান্ত কড়া নির্দেশিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— “২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওপার বাংলায় ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে যাঁরা প্রাণ বাঁচাতে ভারতে এসেছেন, তাঁদের গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার কোনো পুলিশের নেই।”
এরপরই সভায় উপস্থিত লক্ষাধিক মতুয়া মানুষের উদ্দেশ্যে এক নজিরবিহীন আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ঘোষণা করেন— “বনগাঁ, বারাসাত, রানাঘাট সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলে পূর্ববর্তী তৃণমূল জমানায় মিথ্যে মামলায় যে সমস্ত মতুয়া শরণার্থী ভাই-বোনেরা বিনা বিচারে বন্দি হয়ে রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আইনি লড়াই লড়ে সসম্মানে জেল থেকে বের করে আনবে এই সরকার। শুধু মুক্ত করাই নয়, উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের মডেলের মতো তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য বিনামূল্যে জমি দেওয়া হবে এবং মাথার ওপর পাকা বাড়িও তৈরি করে দেবে রাজ্য সরকার।”
একই সাথে মতুয়াদের দীর্ঘদিনের নাগরিকত্বের দাবিকে সিলমোহর দিয়ে শুভেন্দু নিশ্চিত করেছেন যে— আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই সমস্ত যোগ্য মতুয়া শরণার্থীর হাতে সিএএ-র স্থায়ী ভারতীয় নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট পৌঁছে দেওয়া হবে।
বঞ্চনার ইতিহাস মুছে মতুয়াদের জমি, বাড়ি আর মর্যাদাপূর্ণ নাগরিকত্বের এই মেগা প্রতিশ্রুতি ঠাকুরনগরের রাজনৈতিক সমীকরণকে যে এক ধাক্কায় চিরতরে বদলে দিল, তা বলাই বাহুল্য!