সনাতন সংস্কৃতির শাশ্বত ভক্তিভাব আর আধুনিক প্রজন্মের প্রাণবন্ত তারুণ্য— এই দুইয়ের এক নজিরবিহীন ও রোমাঞ্চকর মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকল দেশের রাজধানী নয়াদিল্লি! ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম প্রাণপুরুষ, একাত্ম মানবতাবাদের প্রবক্তা পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ১১০তম জন্মবার্ষিকীতে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে ধরা দিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুক্রবার দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় পার্কে আয়োজিত হয়েছিল বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘ভজন ক্লাবিং’ মহোৎসব। আর সেই অনুষ্ঠানে ভিআইপি দূরত্বের গণ্ডি ভেঙে একেবারে সাধারণ আসনে বসে GenZ অর্থাৎ নব্য প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের পাশে বসে ভজন সন্ধ্যার অনাবিল আনন্দ উপভোগ করলেন প্রধানমন্ত্রী!
কিন্তু কী এই ‘ভজন ক্লাবিং’, যা নিয়ে আজ সারা দেশে তরুণ সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক বিরাট উন্মাদনা? এটি আসলে চিরাচরিত ভক্তিসঙ্গীতের এক আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপান্তর। সাধারণ রক বা পপ কনসার্টের মতোই বিশাল মঞ্চ, ইলেকট্রনিক মিউজিক, ড্রামসের আধুনিক বিট এবং লেজার লাইটের আলোর ঝলকানি— অথচ গানগুলি কোনো পশ্চিমা পপ নয়, বরং ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ কিংবা ‘রাধে রাধে জপ চলে আয়েঙ্গে বিহারি’-র মতো পবিত্র নামসংকীর্তন! নিজের শিকড় আর সনাতনী আধ্যাত্মিকতাকে আধুনিক মিউজিক গিগের ছন্দে আপন করে নিয়েছে ভারতের আজকের জেন-জি প্রজন্ম। আর সেই উন্মাদনার স্রোতে সামিল হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করে দিলেন— নতুন ভারত নিজের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেই আধুনিকতার পথে হাঁটতে জানে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মহান রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন— দীনদয়ালজির দেওয়া কালজয়ী ‘অন্ত্যোদয়’ দর্শন আজও সরকারের প্রতিটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি। অন্ত্যোদয়ের মূল মর্মার্থই হলো— সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া, দরিদ্র ও প্রান্তিকতম মানুষটির কাছে যতক্ষণ না পর্যন্ত উন্নয়নের সুফল পৌঁছচ্ছে, ততক্ষণ রাষ্ট্রগঠন অসম্পূর্ণ। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া বার্তাতেও মোদীজি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেন— পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় ছিলেন সত্যিকারের এক রাষ্ট্রসেবক ও সাধক। সমাজের অন্তিম ব্যক্তির উত্থানই দেশ গঠনের প্রধান ভিত্তি— এই আদর্শকে অন্তরে ধারণ করে দেশবাসীকে সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব পালনের নতুন সংকল্প নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
১৯১৬ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মহান বিপ্লবী নেতা ছোটবেলা থেকেই স্পষ্টবাদী ও আপসহীন চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন। ১৯৪০ সালে তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বিখ্যাত ‘রাষ্ট্রধর্ম’ পত্রিকার পথচলা। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তিনি ভারতীয় জনসংঘের সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের ভুল নীতি ও তোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যান। ১৯৬৮ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মুঘলসরাই জংশনের কাছে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে এই মহান চিন্তাবিদের আত্মবলিদান ঘটেছিল। তাঁর সেই মহান আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতেই আজ সেই মুঘলসরাই জংশন সগৌরবে ‘পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন’ নামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অতীতে রাজনৈতিক সভা-সমিতির চেনা কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে নতুন প্রজন্মের তরুণদের নিজস্ব ভাষায় তাঁদের পাশে বসা এবং সনাতনী দর্শনের সাথে তাদের যোগসূত্র স্থাপন করা— দীনদয়াল পার্কের এই ভজন ক্লাবিং অনুষ্ঠান যেন নতুন ভারতের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের এক অনন্য রূপ হয়ে ধরা দিল!
