রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের গুরুগম্ভীর ইমেজ নয়, রাজপথে নেমে এক্কেবারে ঘরের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে! বাইক থামিয়ে হেলমেট খুলে এক স্কুলপড়ুয়ার সেলফি তোলার আব্দার হাসিমুখে পূরণ করলেন ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই চোখ বড় করে দিলেন কড়া শাসন— “ক্লাস টেনের আগে যেন আর এই মোবাইলে হাত না পড়ে! তোকে লাস্টবার বলে দিলাম, এখন শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা করবি।” ছোটদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে সমাজ যখন গভীর উদ্বেগে, তখন খোদ মুখ্যমন্ত্রীর এমন প্রত্যক্ষ ও কড়া অভিভাবকত্ব নিমেষের মধ্যে মন ছুঁয়ে গিয়েছে উপস্থিত সাধারণ মানুষের।
ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার হাওড়ায়। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের মর্মান্তিক বিপর্যয়ে প্রাণ হারানো হাওড়ার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বজনহারা পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়ে যখন তিনি বাইকে চেপে ফিরছিলেন, তখনই এলাকার স্থানীয় মানুষ ও পথচলতি জনতা তাঁকে ঘিরে ধরেন। মানুষের ভালোবাসার টানে মুখ্যমন্ত্রী বাইক থেকে নামতেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে রাজদীপ পাল নামের এক খুদে স্কুলপড়ুয়া। হাতে দামি স্মার্টফোন উঁচিয়ে সে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আব্দার করে বসে— তাঁর সাথে একটি সেলফি তুলতে চায়।
খুদে স্কুলপড়ুয়ার এমন আবদার শুনে মুখ্যমন্ত্রী বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি। বরং তৎক্ষণাৎ মাথা থেকে হেলমেটটি খুলে নেন। কিন্তু সেলফি তোলার ফ্রেম তৈরি হতে না হতেই খুদের হাতে চকচকে মোবাইল দেখে ভ্রু কুঁচকে ওঠে শুভেন্দু অধিকারীর। তিনি সরাসরি সেখানে উপস্থিত পরিবার ও অভিভাবকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন— “ওকে এই বয়সে মোবাইল ফোন কে কিনে দিয়েছে?” এরপরই একাধারে স্নেহ আর কড়া অনুশাসনের সুরে রাজদীপের কাঁধে হাত রেখে চোখ বড় করে তিনি বলে ওঠেন— “এইটাই যেন শেষ হয়! ক্লাস টেন পাস করার আগে যেন তোকে আর মোবাইল ছুঁতে না দেখি। লাস্টবার বলে দিলাম। মোবাইলে একদম হাত দিবি না, মন দিয়ে শুধুই পড়াশোনা করবি।” তবে বকাঝকা করলেও রাজদীপের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের হাসিমুখের সেলফি ফ্রেম উপহার দিতে ভোলেননি তিনি।
বাস্তবে নতুন প্রজন্মের এই মোবাইল নির্ভরতা ও অনলাইন আসক্তি নিয়ে এর আগেও বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনিক সভা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য মঞ্চে তিনি একাধিকবার সোজাসাপটা বলেছেন— মোবাইল ফোন আজকের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। মাঝরাত পেরিয়ে রাত দেড়টা-দুটো পর্যন্ত খুদেরা স্ক্রিনে চোখ আটকে রাখছে, ফলে পড়াশোনা এবং সুস্থ ঘুমের অভ্যাস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অভিভাবকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বিরুদ্ধেও তিনি অতীতে সরব হয়েছিলেন।
হাওড়ার রাজপথে দাঁড়িয়ে রাজদীপকে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর এই স্নেহমাখা অথচ কড়া ধমক আসলে বাংলার প্রতিটি ঘরের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যেই এক জরুরি সতর্কবার্তা। ভিআইপি প্রটোকল ভুলে একজন প্রকৃত অভিভাবকের মতোই পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথে রাখার এই আন্তরিক চেষ্টা আবারও প্রমাণ করল— ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাবই শুভেন্দু অধিকারীর সুশাসনের আসল পরিচয়!
