A mild verbal reprimand for a student arriving late to class.

ভরা এজলাসে শিক্ষকের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেন খোদ বিচারক! ক্লাসে দেরিতে আসা ছাত্রকে সামান্য মৌখিক শাসন !

যিনি নিজের সমস্ত জীবন বিলিয়ে দেন সমাজ গড়ার কাজে, যাঁদের হাত ধরে তৈরি হয় দেশের ভবিষ্যৎ—আজ সেই শিক্ষকের অসম্মান দেখে স্তম্ভিত গোটা দেশ। স্কুলের ক্লাসরুমে ছাত্রকে একটু শাসন করার অপরাধে এক শিক্ষককে চোরের মতো গ্রেফতার করল পুলিশ! কিন্তু যখন সেই মামলার বিবরণ আদালতের কাঠগড়ায় এসে পৌঁছাল, তখন যা ঘটল, তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে থাকবে। মামলার সত্যতা শুনে ভরা এজলাসে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইলেন স্বয়ং বিচারক! ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুলিশ প্রশাসনকে দিলেন কড়া ধমক। কে এই শিক্ষক? কেনই বা তাঁর সাথে এমন অন্যায় আচরণ করা হলো? আর আদালত চত্বর থেকে বেরোতেই কেন কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি?

ঘটনাটি কোচবিহারের মাথাভাঙা হাইস্কুলের। সেদিন স্কুলের প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়ে গিয়েছিল, ক্লাসে রোল কলও প্রায় শেষের মুখে। ঠিক সেই সময় ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্র ক্লাসে ঢোকার চেষ্টা করে। স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী কর্তব্যরত শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তার এত দেরি হলো? ব্যস, এইটুকুই! অভিযোগ, সেই ছাত্র শিক্ষকের মুখের ওপর অত্যন্ত অভব্য ভাষায় তর্ক শুরু করে। শুধু তাই নয়, শিক্ষক যখন ডায়েরি পরীক্ষা করেন, তখন দেখতে পান যে ওই ছাত্র গত তিন দিন ধরে স্কুলে আসেনি এবং অভিভাবকের কোনো সইও করিয়ে আনেনি। শিক্ষক হিসেবে তন্ময় বাবু তাকে কেবল মৌখিকভাবে একটু শাসন করেছিলেন। কিন্তু সেই ছাত্র বাড়ি গিয়ে মা-বাবার কাছে নালিশ করতেই শুরু হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডব।

অভিভাবকেরা স্কুলে এসে প্রধান শিক্ষকের সাথে অভব্যতা করার পরও শান্ত হননি। তাঁরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরাসরি থানায় গিয়ে শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন। পুলিশও অতি-সক্রিয়তা দেখিয়ে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৬(২), ১১৫(২) এবং ১১৭(২) ধারায় মামলা রুজু করে সরাসরি শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে নেয়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে মাথাভাঙার শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। মামলাটি যখন জেলা আদালতে ওঠে, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয় আদালত কক্ষ। সরকারি আইনজীবী থেকে শুরু করে আদালতের সমস্ত আইনজীবী দলমত নির্বিশেষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন তাঁদের শিক্ষকের পাশে।

আদালতের এজলাসে যখন এই মামলার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়, তখন রাগে ও ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে যান বিচারক। পুলিশি অতি-সক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করে বিচারক প্রশ্ন তোলেন—এই ধরনের ভিত্তিহীন মামলা কেন আদালতে আসবে? কেন একজন শিক্ষকের সাথে অপরাধীর মতো আচরণ করা হলো? তদন্তকারী অফিসারকে কারণ দর্শানোর কড়া নোটিশ জারি করে বিচারক এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন।

“শিক্ষকেরা সেদিন আমাদের শাসন করেছিলেন বলেই আজ আমরা এই উচ্চ আসনে, এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। শিক্ষকেরা যদি তাঁদের মতো করে শাসন না করেন, তবে ভবিষ্যৎ সমাজ কীভাবে তৈরি হবে?”
এরপরই অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়ে ভরা আদালতে শিক্ষকের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং হাতজোড় করে ক্ষমা চান বিচারক। তিনি শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তীকে সসম্মানে নিঃশর্ত পিআর বন্ডে মুক্তির আদেশ দেন।

জামিনে মুক্ত হয়ে শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তী যখন আদালতের বাইরে পা রাখলেন, তখন সেখানে তৈরি হলো এক রূপকথার দৃশ্য। বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিল তাঁর শত শত ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষ। প্রিয় শিক্ষককে দেখা মাত্রই শুরু হয় মুহুর্মুহু পুষ্পবৃষ্টি। ফুলের মালায় বরণ করে নেওয়া হয় সমাজ গড়ার কারিগরকে। এত ভালোবাসা আর সম্মান দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তন্ময় বাবু। ডুকরে কেঁদে উঠে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে হাত তুলে আশীর্বাদ করে তিনি শুধু এটুকুই বললেন—”আমি জানি না এই ফুলের মালা আমার প্রাপ্য কিনা। শুধু এটুকু বুঝেছি, এত বছরের শিক্ষকতার জীবনে যাদের মানুষ করতে চেয়েছিলাম, তারা সত্যিই আজ মানুষ হয়েছে। তোরা অনেক বড় হ।”

মাথাভাঙার শিক্ষক সমাজের এই ঐক্যবদ্ধ লড়াই প্রমাণ করে দিল, ক্ষমতার দম্ভে শিক্ষকের মর্যাদা ধুলোয় মেশানো যায় না। শিক্ষকেরা আছেন বলেই সমাজ আজও আলোর দিশা পায়। শিক্ষককে দেওয়া বিচারকের এই ঐতিহাসিক সম্মান এবং পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তা নিয়ে আপনার কী মনে হয় ? কমেন্ট বক্সে জানান আপনার মূল্যবান মতামত ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *