এক মাসের মধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। বিজেপি সরকার গঠনের পর শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। তারই অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে আরএসএসে যোগদানের বিপুল সংখ্যক আবেদন। এই ঘটনাকে অনেকেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আরএসএস নিয়ে নানা বিতর্ক, আলোচনা এবং রাজনৈতিক মতভেদ ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে সংগঠনটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ যে বেড়েছে, আবেদনপত্রের সংখ্যা তারই প্রমাণ দিচ্ছে।প্রায় ২৫ লক্ষ আবেদন জমা পড়ার দাবি নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ থেকে প্রায় ৯ লক্ষ আবেদন আসার খবর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আরএসএসের প্রতি আগ্রহ সমানভাবে তৈরি হচ্ছে না, বরং কিছু এলাকায় তা অনেক বেশি।
তবে আরএসএসের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় হিসেবে দেখছে না। সংগঠনের বক্তব্য, তারা নিজেদের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তাই হঠাৎ করে ব্যাপক সদস্য সংগ্রহের বদলে তারা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
সংঘের দাবি, তাদের মূল লক্ষ্য হলো সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে শৃঙ্খলা, চরিত্র গঠন, দেশপ্রেম এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করার ওপর তারা গুরুত্ব দেয়। সেই কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবেগে কেউ সংগঠনে যোগ দিক, তা তারা চাইছে না।এই কারণেই ধীরে চলো নীতির কথা বলা হচ্ছে। আবেদন জমা পড়লেই সরাসরি সদস্যপদ দেওয়ার পরিবর্তে আবেদনকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানার প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের মতে, আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানুষদেরই যুক্ত করা উচিত।
আরএসএস নেতৃত্বের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সংগঠনের ভাবমূর্তি ও আদর্শগত শুদ্ধতা বজায় রাখা। দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে যদি এমন কেউ প্রবেশ করে, যিনি সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও দর্শনের সঙ্গে একমত নন, তাহলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই সদস্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসে যোগদানের এই প্রবণতা শুধু একটি সাংগঠনিক ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। আগামী দিনে এই বিপুল আগ্রহকে সংগঠন কীভাবে বাস্তব সদস্যপদে রূপান্তরিত করে এবং তার প্রভাব রাজ্যের সমাজ ও রাজনীতিতে কতটা পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
উত্তরবঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক আবেদন আসার বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং উন্নয়নের মতো বিষয়গুলি সেখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে আরএসএসের আদর্শের প্রতি আকর্ষণ সেই অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে, আরএসএসের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আগ্রহকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা। অনলাইনে আবেদন করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। তাই নতুন আবেদনকারীদের মধ্যে কারা সত্যিই আদর্শগতভাবে যুক্ত হতে চান এবং কারা শুধুমাত্র বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে আবেদন করেছেন, তা যাচাই করা সংঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।