পাবলিকের টাকায় গেরুয়া রাজনীতির উৎসব! বেহাল রাস্তা আর আলোর অভাব ভুলে কেন পুলিশের ভলেন্টিয়ারের পোশাকে কমলা ছোপ?

বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর এবার সরাসরি থাবা বসানোর এক নতুন চক্রান্ত প্রকাশ্যে এল। শহর কলকাতার শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাহী কলকাতা পুলিশকে এবার প্রকাশ্যেই ‘বিজেপিকরণ’-এর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। দুর্গাপূজার ভিড় সামলাতে ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে লালবাজারের নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবকদের (ভলান্টিয়ার) জন্য যে নতুন পোশাক ও ড্রেসকোড চূড়ান্ত করা হয়েছে, তার রঙ করা হয়েছে ঘোর ‘কমলা’। যে গেরুয়া ও কমলা রঙকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিজেপি ও সংঘ পরিবার তাদের বিভাজনের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা চালায়, ঠিক সেই রঙই এখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কলকাতা পুলিশের স্বেচ্ছাসেবকদের গায়ে। আর এই মারাত্মক রাজনৈতিক তোষণ ও রঙের খেলায় সায় দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ঘাম-রক্তের উপার্জিত প্রায় এক কোটি টাকা সম্পূর্ণ অপচয় করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লালবাজার পুলিশ সদর দপ্তর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই কমলা জামা ও টুপির নকশা তৈরি করেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, মোট ২০ হাজার সেট কমলা রঙের ড্রেস ও টুপি তৈরি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১২ হাজার গাঢ় কমলা এবং ৮ হাজার হালকা কমলা রঙের ফুলহাতা কলার দেওয়া পোশাক, যার সামনে খোদ কলকাতা পুলিশের লোগো খোদাই করা থাকবে। শুধু তাই নয়, এর সাথে দেওয়া হবে কমলা রঙের টুপিও। এই বিশাল পরিমাণ পোশাকের জন্য শুধুমাত্র জামা বাবদ ৭৩ লক্ষ টাকা এবং টুপির জন্য ১৬ লক্ষ টাকা—অর্থাৎ মোট ৮৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুজোয় কাজ করার জন্য লালবাজার প্রতিবছর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, এনসিসি ক্যাডেট এবং স্থানীয় ক্লাবের তরুণ সদস্যদেরই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ করে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছোট ছোট শিক্ষার্থী ও তরুণদের গায়ে কমলা পোশাক চাপিয়ে দিয়ে তাঁদের অবচেতন মনেও এক ধরনের বিশেষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গন ও প্রশাসনিক নজরদারির জায়গাকে এভাবে কৌশলে ‘গেরুয়ায়ন’ করার এই চক্রান্তকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আজ যদি স্বেচ্ছাসেবকদের গায়ে এই পোশাক চাপানো যায়, তবে আগামী দিনে কি থানাগুলোর দেওয়ালেও একই রঙ পড়বে?—এমনই আশঙ্কাজনক প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হচ্ছেন সচেতন নাগরিকেরা।
বাস্তবতা হলো, শারদীয় উৎসবের মুখে সমগ্র রাজ্য তথা কলকাতার ছবিটা ঠিক কেমন? শহরের একাধিক বুনিয়াদি রাস্তাঘাট বেহাল ও খানাখন্দে ভরা, বহু গলিপথে ঠিকমতো পথবাতি জ্বলে না, সাধারণ মানুষ ডেঙ্গি ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত, আর ফুটপাথের হকারদের রোজি-রুটি বন্ধের জোগাড়। বাংলার আপামর আমজনতা যখন জীবনযাত্রার নাভিশ্বাসে হাসি ভুলে গেছে, তখন প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা ব্যস্ত জনগণের কোটি টাকা স্রেফ বিজেপিঘেঁষা রঙচঙে সাজসজ্জায় উড়িয়ে দিতে! জনস্বার্থের অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে সম্পূর্ণভাবে শিকেয় তুলে রেখে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীককে প্রসন্ন করার উদ্দেশ্যে এমন কোটি কোটি টাকার হরিলুট প্রশাসনিক চরম অবিবেচকতারই নির্লজ্জ প্রমাণ। বাংলার সচেতন মানুষ এই অপব্যয় এবং প্রশাসনিক গেরুয়াকরণের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *