নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই এবার আরও কড়া অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি তুললেন তিনি। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গে পুরনো ভোটার তালিকা ব্যবহার করে ফের বিধানসভা নির্বাচন করার দাবিও জানিয়েছেন মমতা। বুধবার ফেসবুক লাইভে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একাধিক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি।
এই বক্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশ্যে আসা খবর। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। গত প্রায় দশ মাসে তাঁদের তরফে একাধিক লিখিত আপত্তির কথা সামনে এসেছে। ভোটারদের নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া, পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁদের আপত্তি ছিল বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষ করে SIR-এ নতুন ভোটারদের আবেদনপত্র, ভোটার ডেটাবেসে অ্যাক্সেস এবং বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও ভোটার তালিকা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে প্রশ্ন তোলার তথ্য সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতেই মমতার দাবি, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি এতদিন তিনি তুলছিলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেগুলিই সামনে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, কমিশনের সিদ্ধান্তের কারণে বহু ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখানেই বড় দাবি মমতার। তাঁর বক্তব্য, যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের পুরনো তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে যে সমস্ত রাজ্যে বিজেপি নির্বাচনে জয় পেয়েছে, সেখানেও পুরনো ভোটার তালিকা ব্যবহার করে পুনরায় নির্বাচন করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে এই দাবি রাজনৈতিক বক্তব্য; এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনও নির্বাচন ঘোষণা হয়নি।
মমতা একইসঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে বিজেপির সুবিধা হয়েছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়েও তিনি গুরুতর অভিযোগ করেন।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের আধিকারিক সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, SIR প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে বহু নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা ছিল।
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। কমিশন জানিয়েছে, SIR-সহ গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল। দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তির অস্তিত্ব অস্বীকার না করেও কমিশন সেগুলিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে। অর্থাৎ, আপত্তি বা মতপার্থক্য থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবেই নেওয়া হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
ফলে ভোটার তালিকার SIR নিয়ে বিতর্ক এবার নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। একদিকে কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে কমিশনের সর্বসম্মতির দাবি—তার মাঝেই মমতার গ্রেফতার এবং পুরনো ভোটার তালিকায় ফের ভোটের দাবি ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।