দেশের ভবিষ্যৎ অর্থাৎ শিক্ষার্থী ও যুব সমাজের ওপর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জ এবং অমানবিক নির্যাতন নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারলেন না দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সংসদের বাদল অধিবেশনের শেষ দিনে অন্তত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এই জ্বলন্ত ইস্যুতে একটি বিবৃতি দেওয়া হবে বলে দেশবাসী আশা করলেও, মোদি সরকারের সেই চেনা পলায়নবাদী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন রূপটাই ফের একবার নগ্নভাবে ফুটে উঠল। ছাত্রদের দাবি ও তাঁদের ওপর চালানো পুলিশি তাণ্ডব নিয়ে সংসদে বিরোধীদের মুখোমুখি হওয়ার ন্যূনতম সাহস দেখাল না শাসক শিবির।
দিল্লি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ -র ‘সংসদ ভবন চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার্থী ও যুবদের ওপর যে নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছে পুলিশ, তাতে ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। কথা ছিল বাদল অধিবেশনের সমাপ্তি দিবসে লোকসভায় দাঁড়িয়ে সব প্রশ্নের জবাব দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিন্তু অধিবেশন শুরু হতেই যখন বিরোধীরা ওয়েলে নেমে ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বয়ানের দাবিতে গর্জে উঠলেন, তখন কোনো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা না করে তড়িঘড়ি অধিবেশন স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে ও গোলমাল এড়াতে স্পিকার ওম বিড়লা নিয়ম ভেঙে পুরো ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বাজিয়ে অধিবেশন শেষ করার নজিরবিহীন পথ বেছে নিলেন। বিরোধীদের অভিযোগ—জাতীয় পতাকাকে যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে মোদি সরকার ব্যবহার করে, ঠিক সেভাবেই এবার সংসদীয় নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে সঙ্গীতকে ঢাল বানিয়ে উত্তর দেওয়া থেকে পালিয়ে বাঁচলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংসদের ভেতরে জবাবদিহি না পেয়ে বাইরে চরম বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিরোধী সাংসদরা। কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির প্রতিনিধিরা একজোট হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাপুরুষোচিত আচরণকে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেন। ‘৫৬ ইঞ্চির ছোট বান্দর, জলদি আও সংসদ কে আন্দর’—এমনই তীব্র ও কটাক্ষপূর্ণ স্লোগানে কেঁপে ওঠে সংসদ চত্বর। বিরোধীদের সাফ প্রশ্ন, হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যতের ওপর ছিনিমিনি খেলে এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের রক্ত ঝরিয়ে কোন মুখে বিজেপি সরকার নিজেদের ‘সুশাসন’-এর ঢোল পেটায়?
পুরো বাদল অধিবেশনজুড়ে সরকারের এই স্বৈরাচারী ও এড়িয়ে যাওয়ার নীতির কারণে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি কাজ মুলতুবি থেকেছে। আর সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে কোনো আলোচনা বা বিতর্ক ছাড়াই ১৯টি জনবিরোধী বিল একতরফাভাবে পাশ করিয়ে নিয়েছে কেন্দ্র। একদিকে যুবদের দাবির প্রতি নির্মম উদাসীনতা, অন্যদিকে সংসদে বিরোধী কণ্ঠকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার এই চক্রান্ত মোদি সরকারের স্বৈরাচারী মানসিকতাকেই পুনরার প্রতিষ্ঠা করছে। গণতন্ত্রের পিঠস্থান সংসদকে এভাবে প্রহসনে পরিণত করার পর অমিত শাহ বা নরেন্দ্র মোদির কাছে দেশের যুব সমাজের প্রশ্নের উত্তর চাওয়ার সময় এখন উপস্থিত। ছাত্রদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বিল পাশ করানোর এই স্বৈরাচারী মানসিকতাই স্পষ্ট করে দেয় যে, মোদি সরকার আসলে দেশবাসীকে উত্তর দিতে নয়, বরং ভয় পেয়ে সত্যকে ধামাচাপা দিতেই বেশি অভ্যস্ত!
