ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর বাংলায় বিজেপি সরকার গঠন করলেও দলের ভেতরের শৃঙ্খলা ও আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না! ক্ষমতায় আসার অহংকারে যদি কোনো নেতা বা কর্মী তৃণমূলের অপসংস্কৃতিকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেন, তবে তাঁদের দল থেকে ছুড়ে ফেলতে এক মুহূর্তও হাত কাঁপবে না শীর্ষ নেতৃত্বের। রবিবার নিউটাউনের কনভেনশন সেন্টারে রাজ্য বিজেপির মেগা সাংগঠনিক পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত হয়ে ঠিক এই ভাষাতেই রাজ্য নেতাদের কড়া বার্তা দিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন। ঐতিহাসিক পালাবদলের পর এই প্রথম তাঁর বঙ্গ সফর। আর প্রথম বৈঠকেই দলের অন্দরে কোনো রকম সুবিধাবাদ বা বেনোজল সহ্য না করার চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন— “তৃণমূলীকরণ কোনোভাবেই চলবে না!”
নিউটাউনের সেই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার সহ রাজ্য কমিটির সমস্ত শীর্ষ পদাধিকারী, বিধায়ক, সাংসদ ও বিভিন্ন জেলার সভাপতিরা। সদ্য ঘোষিত রাজ্য কমিটি ও ৭ জেলা সভাপতির রদবদলের পর এই সমন্বয় বৈঠকে নিচুতলার কিছু অনভিপ্রেত অভিযোগ নিয়ে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন নীতীন নবীন।
তিনি সাফ বলেন— “দলে কোনো রকম দুর্নীতি, তোলাবাজি, কাটমানি, দাদাগিরি কিংবা সিন্ডিকেট রাজ বরদাস্ত করা হবে না! এই নোংরা সংস্কৃতির কারণেই কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষ একদা অপরাজেয় দাবি করা তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে। ক্ষমতা এসেছে বলে যদি বিজেপির কোনো নেতা বা কর্মী মনে করেন তাঁরা যা ইচ্ছা তাই করবেন, তবে মনে রাখবেন শীর্ষ নেতৃত্ব সবার ওপর কড়া নজর রাখছে। কোনো নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একই সাথে দলের জনপ্রতিনিধি ও সংগঠনের মধ্যে তৈরি হওয়া ফাটল মেরামতের কড়া দাওয়াই দেন সর্বভারতীয় সভাপতি। বেশ কিছু জেলায় বিধায়কদের সঙ্গে জেলা সভাপতিদের মতপার্থক্য এবং ‘সমান্তরাল কাজকর্ম’ চালানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, তা বন্ধ করে সরকার এবং সংগঠনের মধ্যে একশো শতাংশ সমন্বয় বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ঔদ্ধত্য ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগের কথা টেনে তিনি নেতাদের সতর্ক করে বলেন— “অনেকে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ হওয়ার পর সংগঠনকে আর পাত্তা দিচ্ছেন না। এই ধরনের সুবিধাবাদী নেতাদের দলে কোনো প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেকে ‘প্রধান সেবক’ বলেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলায় ‘সেবকের’ ভূমিকায় কাজ করছেন। তাই প্রতিটি নেতা-কর্মীকেও অহংকার ত্যাগ করে আমজনতার সেবক হয়ে মানুষের দুয়ারে পৌঁছাতে হবে।”
দলে অপরিকল্পিত দলবদল ও তৃণমূলের লোক ঢোকানোর প্রশ্নেও নীতীন নবীনের বার্তা অত্যন্ত কড়া। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন— বেনোজল আটকে রাখতে হবে; কোনো দলবিরোধী বা নীতিবিরোধী চরিত্র যেন তলে তলে বিজেপির খাঁচায় ঢুকে সংগঠনের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে। সূত্রের খবর, এক জেলা সভাপতি ‘ভালো তৃণমূল’ কর্মীদের দলে নেওয়ার প্রস্তাব তুললেও তাতে খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি শীর্ষ নেতৃত্ব। বরং নিছক সরকারের ওপর ভরসা করে বসে না থেকে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে আগামী ৭ই অক্টোবরের মধ্যে প্রতিটি বুথে নিবিড় প্রচার ও জনসংযোগ কর্মসূচি শেষ করার কড়া ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার মর্যাদা রক্ষা করে শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলাই যে বঙ্গ বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য— নিউটাউনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে সেই বার্তাই খোদাই করে দিলেন নীতীন নবীন!
