রাস্তাঘাট কিংবা মন্দির চত্বরে যে অসহায় মানুষগুলি পথচারীদের করুণার আশায় হাত পেতে বসে থাকেন, যাঁদের কাছে একটা বা দুটো মুদ্রাও একবেলার খাবারের সংস্থান— সেই নিঃস্ব ভিক্ষুকের জীবন থেকে কি কখনো এমন কোনো গল্প উঠে আসতে পারে, যা কোটিপতিকেও হার মানিয়ে দেবে? চোখ কপালে ওঠার মতো হলেও, অন্ধ্রপ্রদেশের মাটিতে ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য, নজিরবিহীন এবং আত্মত্যাগের অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক! পাঁচ বছর ধরে রোদ-ঝড়-জল মাথায় নিয়ে ভিক্ষা করে জমানো একটি-দুটি টাকার সম্পূর্ণ সঞ্চয়— এককালীন ১৭ লক্ষ টাকা— তিনি নিঃস্বার্থভাবে দান করে দিয়েছেন একটি মন্দিরের উন্নয়নে!
এই মহামানবতুল্য ব্যক্তির নাম শিবরাম রেড্ডিয়ার। অন্ধ্রপ্রদেশের মারকাপুর জেলার কোল্লিমালাইয়ের বাসিন্দা তিনি। ত্রিপুরান্তকম গ্রামের বিখ্যাত বালা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী মন্দিরের সামনে বসে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি লক্ষ্য করতেন এক মর্মান্তিক দৃশ্য। বিশেষ বিশেষ উৎসব ও পুজোয় যখন দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্তের ঢল নামত, তখন মন্দিরে প্রবেশের জন্য ভক্তদের মধ্যে চলত চরম ধাক্কাধাক্কি। পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের এই সীমাহীন দুর্ভোগ দেখে ব্যথাতুর হয়ে উঠত শিবরামের মন।
সাধারণ মানুষ হয়তো কেবল দুঃখ প্রকাশ করেই পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন, কিন্তু চরম অভাবের মধ্যেও শিবরাম রেড্ডিয়ার সংকল্প নিয়েছিলেন এক স্থায়ী সমাধানের। তিনি ঠিক করেন— ভক্তদের নিরাপদে ও সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে মা দর্শনের জন্য মন্দির চত্বরে একটি মজবুত লোহার রেলিং তৈরি করে দেবেন। কিন্তু একজন ভিক্ষুকের পক্ষে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচে এমন রেলিং বসানো যে আকাশকুসুম কল্পনা!
তবু নিজের সংকল্প থেকে একচুলও পিছিয়ে যাননি শিবরাম। শুরু হয় তাঁর পাঁচ বছরের এক নীরব, অলৌকিক তপস্যা। বেঁচে থাকার জন্য দিনে মাত্র একবার সামান্য খাবার মুখে তুলতেন তিনি। সেই সামান্য খাওয়ার খরচটুকু বাদ দিলে নিজের শরীর বা জীবনের কোনো আরামের জন্য একটা অতিরিক্ত পয়সাও খরচ করতেন না। পুণ্যার্থীদের দেওয়া এক-দুই টাকার মুদ্রা তিল তিল করে সঞ্চয় করতে শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ বছরের হাড়ভাঙা ত্যাগ, অনাহার ও কঠোর পরিশ্রমের পর যখন সেই জমানো অঙ্ক ১৭ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়, তখন এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করেননি তিনি। সম্পূর্ণ অর্থ তিনি ব্যয় করেন বালা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী মন্দির চত্বরে ভক্তদের জন্য সুদৃশ্য ও স্থায়ী লোহার রেলিং নির্মাণে!
আজ সেই সুবিশাল লোহার রেলিংয়ের কারণে উৎসবের দিনগুলিতেও হাজার হাজার ভক্ত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিরাপদভাবে মায়ের দর্শন পাচ্ছেন। নিজের জন্য কোনো ঘর নেই, ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই— অথচ নিজের সর্বস্ব দিয়ে সমাজের মানুষের জন্য এমন সেবা করার এই ঘটনা সামনে আসতেই মন্দির চত্বরের প্রতিটি পুণ্যার্থী ও স্থানীয় মানুষ হাতজোড় করে প্রণাম জানাচ্ছেন শিবরাম রেড্ডিয়ারকে।
এত বড় আত্মত্যাগের পরও বিন্দুমাত্র অহংকার স্পর্শ করেনি তাঁকে। হাতজোড় করে অত্যন্ত বিনম্র কণ্ঠে তিনি কেবল একটাই কথা বলেন— “আমি তো সামান্য মাধ্যম মাত্র। যা কিছু হয়েছে, সবই মা ত্রিপুরাসুন্দরীর কৃপায়। তিনিই যে আমাকে এই সেবা করার আদেশ দিয়েছিলেন!”
পার্থিব সম্পদের হিসাবে যিনি সমাজের সবচেয়ে নিঃস্ব ও প্রান্তিক, মনের প্রাচুর্যে ও ত্যাগের গরিমায় তিনি যে আজ যেকোনো ধনকুবেরের চেয়েও কতখানি ধনী— শিবরাম রেড্ডিয়ারের এই ১৭ লক্ষ টাকার জনসেবা গোটা সমাজকে সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল!